
মুহাম্মদ জাবেদ হোছাইন
ভারতের উত্তর প্রদেশের এক অচেনা শহরে ইংরেজি হরফে ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখা একটি আলোকিত বোর্ড স্থাপন করা হয়েছিল রাস্তার মোড়ে। জন্মেছিল না কোনো বিদ্বেষ, না কোনো উস্কানি; শুধু এক মুমিন হৃদয়ের স্বতঃস্ফ‚র্ত ভালোবাসা থেকে উচ্চারিত এক বাক্য : ‘আমি মুহাম্মদকেভালোবাসি।’ কিন্তু সেই বাক্যই আজ হয়ে উঠেছে ভয়, আতঙ্ক, এমনকি অপরাধের প্রতীক! পুলিশিতৎপরতা, গ্রেপ্তার, ইন্টারনেট বন্ধ, দোকান সিলগালা-সব মিলিয়ে ‘ভালোবাসি’ শব্দটি যেন হয়ে গেছে অপরাধবোধের নাম! অথচ এটি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি তো মানবতার ইতিহাসে সবচেয়ে সুন্দর প্রেমের ঘোষণা-নবীজির প্রতি ভালোবাসা। যখন ভালোবাসার এই ঘোষণায় বাধা আসে, তখন প্রশ্ন জাগে-কেন ‘আই লাভ মোদি’ বলা যায়; কিন্তু ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ বলা যায় না? কেন একটি নাম উচ্চারণে সমাজ শঙ্কিত হয়? অথচ সেই নাম তো বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শের প্রতীক। তিনি তো এমন একজন, যিনি মিথ্যার অন্ধকারে সত্যের প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন, যিনি নিষ্ঠুরতার যুগে দয়ার সুবাস ছড়িয়ে দিয়েছিলেন!
নবীজির প্রতি ভালোবাসা কেবল অনুভ‚তি নয়, এটি ইমানের কেন্দ্রবিন্দু। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- ‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও সমগ্র মানবজাতির চেয়ে অধিক প্রিয় না হই।’ (সহিহবোখারি ও মুসলিম)। অর্থাৎ নবীপ্রেম শুধু হৃদয়ের কোমলতা নয়, এটি ইমানের শর্ত। যে হৃদয়ে নবীর প্রতি মমতা নেই, সে যতই নামাজ-পর্দা করুক, তার বিশ্বাস অপূর্ণ থাকে। নবীপ্রেমেরএই অনুভ‚তি মানুষকে আল্লাহর দিকে টানে, কারণ নবীকে ভালোবাসা মানে আল্লাহকে ভালোবাসা। নবীকে সম্মান করা মানে আল্লাহর আদেশকে সম্মান করা।
নবী প্রেমিকরা কখনো ভালোবাসাকে মুখের বুলি করে রাখেননি। তাঁরা জীবন, রক্ত, অশ্রু, হাসি- সবকিছু দিয়ে সেই ভালোবাসাকে বাস্তবে প্রমাণ করেছেন। হজরত বিলাল ইবনে রাবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ কৃতদাস। কিন্তু নবীপ্রেমে ছিলেন সাদা আলোর মতো। যখন তাঁকে উত্তপ্ত পাথরের নিচে শুইয়ে নির্যাতন করা হচ্ছিল, তাঁর বুক ফেটে যাচ্ছিল, তবুও তিনি বলছিলেনÑ ‘আহাদ, আহাদ!’ এক আল্লাহ, এক নবী।
যে নবীজির নাম শুনলে তাঁর চোখে জল চলে আসত, সেই নবীজিরইন্তেকালের সংবাদ শুনে হজরত বিলাল (রা.) আর মদিনায় থাকতে পারেননি। নবীজিরইন্তেকালের পর যখন তাঁকে আবার আজানের জন্য অনুরোধ করা হলো, ‘আশহাদুআন্ লা ইলাহাইল্লাল্লাহ’ পর্যন্ত বলেই তিনি থেমে গেলেন; তাঁর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল, কান্নায় মসজিদ কেঁপে উঠল, অশ্রুতে মিনার ভিজে গেল। কেননা ইতোপূর্বে তিনি ‘আশহাদুআন্না মুহাম্মদার রাসূলুল্লাহ’ বললে তাঁর সামনে স্বয়ং নবীজিকে দেখতে পেতেন। নবীজির বিরহে তিনি মদিনা ছেড়ে গিয়েছিলেন। নবীপ্রেমের এমন দৃশ্য ইতিহাসে বিরল।
এক অচেনা মানুষ ওয়াইস আল কারনি (রহ.)। নবীজির সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি তাঁর। তবুও তাঁর প্রতি এমন ভালোবাসা যে, উহুদ যুদ্ধে নবীজির দাঁত মোবারক শহিদ হওয়ার খবর শুনে ওয়াইস নিজেই তাঁর দাঁত ভেঙে ফেলেছিলেন, যাতে তাঁর শরীরে নবীজির বেদনার অংশ থাকে! নবীজিরওফাতের পর যখন হযরতওমর (রা.) ও আলী (রা.) তাঁকে খুঁজে পেলেন, তখন তাঁরা নবীজির রেখে যাওয়া চাদর মোবারক তাঁর হাতে তুলে দিলেন। এমন সম্মান পৃথিবীর আর কেউ পাননি। নবীপ্রেমের এই উদাহরণ প্রমাণ করে, দেখা না হয়েও ভালোবাসা যায়, যদি হৃদয় সত্য হয়।
নবীজির প্রতি সাহাবায়ে কেরামের ভালোবাসার উপমা যেন ইতিহাসের পৃষ্ঠা ভেজানো অশ্রু। উহুদ যুদ্ধে নবীজির দাঁত মোবারক ভেঙে রক্ত ঝরলেসাহাবারা বলেছিলেন- ‘আমরা তৃষ্ণায় মরে যাব; কিন্তু প্রিয় নবীজির মুখে এক ফোঁটা রক্তও পড়তে দেব না!’ তাঁদের ভালোবাসা ছিল এমন যে, নবীজির একটি মাত্র ইশারাই ছিল তাঁদের কাছে জীবন-মরণেরফয়সালা। এক সাহাবি যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর আঘাতে পড়ে যাচ্ছিলেন, অথচ মুখে তখনও বলছিলেন- ‘আমি নবীজির সঙ্গে জান্নাতে দেখা করব।’ এই হলো প্রেমের পরিণতিÑযেখানে মৃত্যুও হয়ে যায় সাক্ষাতের সেতু।
নবীপ্রেমের এমন দৃষ্টান্ত শুধু সাহাবিদের যুগে সীমাবদ্ধ ছিল না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অসংখ্য কবি, সুফি, দরবেশ ও আলেম তাঁদের রক্তে নবীপ্রেমের কাব্য লিখেছেন। ত্রয়োদশ শতকে ইমাম বুসিরি (রহ.) পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন। তিনি নবীপ্রেমে উদ্বেল হয়ে লিখলেন বিখ্যাত কাব্য ‘আল কাসিদাতুলবোরদা’। রাতের নিস্তব্ধতায়নবীজিকে উদ্দেশ্য করে তিনি লিখলেন, “হে নবী, আপনার প্রশংসা লেখা মানে তো আমার জীবন লেখা!’ সেই রাতে তিনি নবীজিকে স্বপ্নে দেখলেনÑনবীজি তাঁর গায়ে নিজের চাদর মোবারক জড়িয়ে দিলেন। আর সকালে ইমাম বুসিরি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলেন। আজও সারা বিশ্বে মসজিদে, দরগাহে, সভায় সেই কাসিদা আবৃত্তি হয় নবীপ্রেমের শ্রদ্ধা হিসেবে। মওলানা রুমি (রহ.) বলেছিলেনÑ ‘যার হৃদয়ে মুহাম্মদের প্রেম জ্বলে, তার জীবনই কাব্য।’ রুমিনবীজির প্রেমকে আল্লাহর প্রেমের সেতু বলে মনে করতেন। তাঁর দৃষ্টিতে নবীজি ছিলেন মানবতা ও খোদায়ি আলোর মিলনরেখা। মুসলিম জাগরণের কবি আল্লামাইকবাল (রহ.) নবীপ্রেমে বলেছিলেন- ‘যদি মুহাম্মদের প্রেম না থাকে, তাওহিদের শব্দ কেবল শূন্য প্রতিধ্বনি।’ ইকবাল বিশ্বাস করতেন, নবীজির আদর্শ ছাড়া কোনো জাতি আত্মমর্যাদা ফিরে পেতে পারে না। তাই তাঁর কবিতায় বারবার উঠে এসেছেÑ‘উঠে দাঁড়াও নবীর উম্মত হয়ে, কারণ তাঁর নামেই লুকিয়ে আছে তোমার মুক্তি।’
নবীপ্রেম শুধু আরব বা পারস্যে সীমিত নয়; এই প্রেম পৃথিবীর প্রতিটি মুসলমানের রক্তে প্রবাহিত। বাংলার সুফি সাধকরা-হজরত শাহজালাল (রহ.), হজরত খানজাহান আলি (রহ.), হজরত বায়েজিদ বোস্তামি (রহ.)-সবাই নবীপ্রেমে জীবন কাটিয়েছেন। বাংলা কবিতায়ও নবীপ্রেম এক গভীর ধারা। কবি গোলাম মোস্তফা, কবি কাজী নজরুল ইসলাম কিংবা আধুনিক কবিদের রচনায় নবীজির নাম শুনলেই হৃদয়ে আলো জ্বলে। কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেনÑ‘নবীজি তব নাম ধরিয়া আছি, প্রাণ জুড়ায় না, হৃদয় জুড়ায় না।’
নবীজিকে ভালোবাসা মানে কেবল তাঁর নামের উচ্চারণ নয়, বরং তাঁর জীবনধারা অনুসরণ করা। তিনি যে শিক্ষা দিয়েছেন-সত্যবাদিতা, দয়া, ক্ষমা, ন্যায়Ñএগুলোই নবীপ্রেমের প্রকৃত প্রতিফলন। একজন সত্যিকারের নবীপ্রেমিক মিথ্যা বলে না, কারও প্রতি ঘৃণা পোষণ করে না, প্রতারণা করে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে আমাকে ভালোবাসবে, সে কিয়ামতের দিন আমার সঙ্গে থাকবে।’ (সহিহবোখারি)। অতএব নবীপ্রেম মানে চিরসঙ্গের প্রত্যাশা, চিরসুখের আশ্রয়।
ভারতের ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, ভালোবাসার ভাষাও এখন রাজনীতির ছুরিতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী-ভালোবাসা কখনো বন্দি থাকে না। যত দমনই হোক, নবীর নাম থেমে থাকবে না, কারণ তাঁর প্রেম কোনো দেয়ালের নয়, এটি হৃদয়ের সীমাহীনদিগন্ত। যে মানুষ নবীজির নাম ভালোবেসে উচ্চারণ করে, সে ঘৃণাকে জয় করে। যে রাষ্ট্র সেই ভালোবাসাকে অপরাধ মনে করে, সে নিজেই অন্ধকারে ডুবে যায়। ভালোবাসার আলোকে নির্বাপিত করা যায় না; বরং সেটিই একদিন পৃথিবীকে আলোকিত করে তোলে।
আজ যখন বিশ্বজুড়ে ঘৃণা, সহিংসতা, বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছে, তখন ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ বলা মানে এক নতুন সূর্যোদয় ঘোষণা করা। কারণ নবীপ্রেম মানে শান্তি, মানবতা, দয়া ও ন্যায়ের চ‚ড়ান্ত রূপ। যাঁরা নবীজিকে ভালোবাসেন, তাঁরা আসলে মানুষকেই ভালোবাসেন। কারণ নবীজির জীবন ছিল মানুষের জন্য দয়া, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও ন্যায়ের প্রতীক। তাই আজ আমরা সবাই একসুরে বলিÑ‘আই লাভ মুহাম্মদ’। আর এই ভালোবাসাই আমাদের পরিচয়, আমাদের আত্মার আলো, আমাদের শান্তি। যত বাধাই আসুক, আমাদের নবীপ্রেমের এই শিখা কখনো নিভবে না। কারণ এটি দুনিয়ার নয়, এটি চিরন্তন আখিরাতের আলো।
লেখক : কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক






