আমরা বিব্রত, চিন্তিত ও শংকিত

1

মুশফিক হোসাইন

সাম্প্রতিক সময়ের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে দেশ জাতি সমাজ ব্যক্তি জীবন নিয়ে বিস্তারিত ভাবা এবং চুলচেরা বিশ্লেষণের মাত্রা বাড়িয়েছে। জাতি পজিটিভ পরিবর্তনের আশায় উন্মুখ। সমাজে ধনাত্মক বিবর্তনের সুবাতাস প্রবাহিত। আম জনতা তার ফলভোগ করার এই সময়ে দেশের বিচার বিভাগ নিয়ে সন্দেহপ্রবণ। অতীত অভিজ্ঞতার ফলে জনমনে সেই শঙ্কা বিরাজমান। ন্যায় বিচার রাষ্ট্রে, সমাজে শান্তি ও সুখ নিশ্চিত করে। সমাজে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনে। তাই গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার প্রথম শর্ত বলে বিবেচিত। ২৪ এর গণআন্দোলনের পর কী আমরা সমাজে তা প্রতিষ্ঠিত হতে দেখছি। সেই অনাকাক্সিক্ষত প্রশ্ন থেকে আজকের এই লেখা।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের কাপ্তাই সড়কের মদুনাঘাট এলাকায় কয়েক জন দুর্বৃত্ত প্রাইভেট কারের গতিরোধ করে বিএনপি সমর্থক একজন ব্যবসায়ীকে হত্যা করে। এটি একটি সা¤প্রতিক উদাহরণ। স্বাধীনতার পর থেকে দেশে এ ধরনের ঘটনার অসংখ্য নজির আছে । উদাহরণত বলা যায় সিরাজ সিকদার, ডাকসু ছাত্র হত্যা, শাপলা চত্বরে হেফাজতের নিরীহ কর্মী হত্যা, পিলখানা হত্যাকান্ড বিশ্বজিৎ হত্যা, ২৪ এর গণ অভ্যুত্থানের অসংখ্য ছাত্র জনতা হত্যাকান্ড এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সংখ্যাতীত হত্যাকান্ডের ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় নি। এ প্রসঙ্গে প্রথম আলো একটি রিপোর্ট উল্লেখ করা যেতে পারে। (সূত্র: ৮ মার্চ ২০১৮ইং) ঐ রিপোর্টে দেখা যায় ঢাকা জেলার পাঁচটি ট্রাইবুনালের ১৫ বছরের ৭ হাজার ৮৬৪ মামলার বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, মাত্র ৩ শতাংশ মামলার আসামিরা শাস্তি পেয়েছে। আর ১৭ হাজার মামলা শাস্তির বাইরে থেকে যায়। ঐ প্রতিবেদনে আরও দেখা যায় যে, ছয় বছর পর নারী নির্যাতন মামলার চিত্র ভিন্ন কিছু বলছে। উক্ত বছরের ২৫ এপ্রিলের প্রতিবেদনে সারা দেশের নারী নির্যাতন ও মামলার চিত্র উঠে এসেছে। ২০০৮ সালের ৬ জুলাই সংঘটিত ফাহমিদা হত্যা মামলার ঘটনার ৬ বছর পর ২০১৪ সালের ৭ জুলাই ঢাকা জেলা দায়রা জেলা জজ আদালত মূল অভিযুক্ত তোজাম্মেহ হোসেনসহ দুজনকে যাবতজীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করেন। কিন্তু ১০ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয় নি। মজার বিষয় হল দন্ডিত দুই আসামী জামিন নিয়ে বহাল তবিয়তে জেলখানার বাইরে অবস্থান করেছেন। নারী নির্যাতনে এবং হত্যা মামলা বছরের পর বছর অনিষ্পতি অবস্থার আছে বলা যায় সারা দেশের একইচিত্র। আর একটি হত্যাকান্ডের কথা যাক। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ এর ঘটনা। সূর্য প্রথম আলো, দৈনিক আজাদী। ঘটনায় প্রকাশ কক্সবাজার বিমান বন্দরের পশ্চিমপাশে বিমানবাহিনীর নির্মাণাধীন ঘাঁটিতে হামলা। ঐ হামলায় বিমান বাহিনীর নিরাপত্তায় নিয়োজিত সদস্যের গুলিতে একটি তরুণ তাজা প্রাণ শিহাব কবির নাহিদ নিহত হয়। তার বয়স মাত্র ৩০ বছর। আহত হয় আরও কয়েকজন। নিহত তরুণ বিমান বাহিনীর নির্মাণাধীন ঘাঁটির পাশের সমিতি পাড়ার বাসিন্দা। একজন উদীয়মান ব্যবসায়ী। তার পিতা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন কক্সবাজার পিটিআইএর প্রাক্তন সুপার এবং মা আমেনা খাতুন কক্সবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক। তাঁরা দুজনেই সরকারি চাকুরী হতে কয়েক বছর আগে অবসর নেন। প্রবীন ও অসুস্থ মাতা পিতার একমাত্র ও সর্বকনিষ্ঠ সন্তান শিহাব। যে তার পিতামাতার দেখভাল করতেন। তার মা দাবি করেন যে, ঘটনার দিন পুত্র শিহাব বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছিল। তখন একটি গুলি এসে তাঁর মাথায় লাগে এবং মাথার খুলি উড়ে যায়।
ঘটনার সূত্রপাত হয় এভাবে স্থানীয় বিএনপির এক কর্মী মোটর সাইকেলে চলার সময় হেলমেট ছাড়া চলাচলে বিমান বাহিনীর ককপোস্টে তাকে আটক করে। বিমান বাহিনীর অধিকৃত সরকারি জমি হতে উচ্ছেদের বিরোধ চলমান থাকায় সমিতি পাড়ার বাসিন্দারা সুযোগ গ্রহন করে। তারা বিমান বাহিনীর সদস্যদের উপর ইট পাটকেল ছোড়ে এবং হামলা চালায়। আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তিতে তাই উল্লেখ ছিল। বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ ছিল উশৃঙ্খল জনতা ঘাঁটিতে প্রবেশের চেষ্টা করে, ফলে রাষ্ট্রিয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা করতে বিমান বাহিনীর সদস্যরা ‘রুলস অব এনগেজমেন্ট’ অনুযায়ী ফাঁকা গুলি ছোড়ে তারা কোন তাজা গুলি ছোড়েনি বলে দাবি করে। ঘটনায় তরুণ শিহাব মারা যায় এবং বিমান বাহিনীর কিছু সদস্য আহত।
ঘটনার প্রেক্ষিতে শিহাবের বাবা একটি মামলা করেন। প্রশ্ন হল তিনি কী ন্যায় বিচার পাবেন ? কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে উল্লেখ করে পাথরের আঘাতে তার মাথার খুলি উড়ে গেছে। তার পিতা এই রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেন। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন বিমান বাহিনী তাজা গুলি ছুড়েছে। তারা গুলির খোসা ও প্রদর্শন করে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন হল এইগুলি কোথা থেকে এল। বিমান বাহিনীর অস্ত্রের লগ রেজিস্ট্রার কি পরীক্ষা করা হয়েছিল। প্রাপ্ত খোসা কি বিমান বাহিনী ব্যবহার করে থাকে ? এ দুটো প্রশ্নের সমাধান হলেই প্রকৃত রহস্য উৎঘাটন হাতে। বিচার বিভাগীয় তদন্তের কোন তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
সরকারের পক্ষ থেকে এ নিয়ে কোন সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই। তবে কি শিহাব এ দেশের কোন নাগরিক নয়। অবসর প্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী তাঁদের একমাত্র তরুণ সন্তান হত্যার বিচারের অধিকার রাখেন না ? জাতীয় মানবাধিকার সংস্থা এ হত্যাকান্ডের কোন তদন্ত করেছে ? একটি তরুণের হত্যাকান্ড এভাবে বিচারহীনতায় অবস্থায় লীন হয়ে যাবে ? আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আদালত এ সম্পর্কে কোন রুলনিশি জারী তরে নি।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী রাত ১১/১২টার সময় শিহাবদের সমিতি পাড়ায় বাড়িতে সমবেদনা জানাতে গিয়ে দেখেন উক্ত এলাকা বিভিন্ন বাহিনীর যুদ্ধাবস্থা। বিভিন্ন বাহিনী শসস্ত্র অবস্থায় পাহাড়া দিচ্ছে এবং তল্লাসী করছে। সবচেয়ে আশ্চর্য্যরে বিষয় হল জেলা প্রশাসন বিমান বাহিনীর কেউ ভুক্ত পরিবারকে সমবেদনা জানাতে যায় নি। হতভ্যাগ্য পরিবারের প্রতিরাষ্ট্রের কোন দায় দায়িত্ব নেই ? প্রশাসন ও বিমানবাহিনী শিহাবকে নিছক দুষ্কৃতিকারী আখ্যা দিয়ে দায় মুক্তি হতে চেয়েছে। অথচ সমিতিপাড়ার আমজনতা শিহাবকে শহীদ আখ্যা দিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠানের নামকরন তার নামে করেছে।
শিহাবের প্রবীণ মা-বাবা বিচার পাবে কি না সন্তেহ। একটি হত্যাকান্ডের বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হলে তথ্য প্রমাণ হারিয়ে/গায়েব হওয়ার নবীর আছে। বিবাদীপক্ষ নানাভাবে চাপও ভয়ভীতির মধ্যে থাকে। বিশেষ করে বাদী পক্ষ আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও বয়সে প্রবীণ হল মামলা পরিচালনা করতে অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসন ও বিমান বাহিনী সুষ্ঠ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাঝে নেই বলে প্রতীয়মান। অথচ রাষ্ট্র ন্যায় বিচারের স্বার্থে আলামত ধামাচাপা না দিয়ে সুষ্ঠুবিচারের উদ্যোগ নেবে, এটা জাতি আশা রাখে। বিচারের বাণী নিভৃতে না কাঁদলেই বরঞ্চ জাতি উপকৃত হবে।

লেখক : কবি, নিসর্গী ও ব্যাংক নির্বাহী (অব)