কারণ চিহ্নিত করে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে

2

গত ১৬ অক্টোবর ২০২৫, বৃহস্পতিবার উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি), আলিম ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডসহ নয়টি সাধারণ বোর্ড মিলে মোট ১১টি শিক্ষা বোর্ড এর ফল একযোগে প্রকাশ করেছে আন্তঃ শিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। এবার সকল বোর্ড মিলে পরীক্ষার্থী ছিল ১২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৬১জন। পাস করেছে ৭লাখ ২৬ হাজার ৯৬০জন। গড়ে পাসের হার ৫৮.৮৩ শতাংশ। গত বছর ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৭৭.৭৮ শতাংশ। সেই সাথে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা। হিসেবে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় ১৯ শতাংশ পরীক্ষার্থী কম পাশ করেছে । সব মিলিয়ে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার পাশের হারে অভাবনীয় বিপর্যয় ঘটেছে বলা যায়। সবচেয়ে বড় হতাশার বিষয় হচ্ছে হচ্ছে সারা দেশে ২০২টি কলেজের কোন পরীক্ষার্থীই পাস করেনি। এর মধ্যে চট্টগ্রামের রয়েছে ৪টি। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ, হাজী মোহাম্মদ মহসিন কলেজ যেখানে এসএসসিতে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে সর্বোচ্চ নম্বরধারীদের ভর্তি করা হয়, সেইখানেও অনুত্তীর্ণ হয়েছে অনেক শিক্ষার্থী, যা ভাবনার মধ্যেও কারো ছিল না। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত কলেজ সমূহেও পাসের হার আগের তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ কম। তবে সারাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পাসের হার সবচেয়ে বেশি। এ বোর্ড এর পাসের হার ৭৫ শতাংশের ওপরে। মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার্থীদের মুখে হাসি ফুটলেও সাধারণ শিক্ষা বোর্ডর অধিনস্থ কলেজসমুহে চলছে বেদনার কান্না। ব্যর্থতার কালো মেঘ প্রায় প্রতিটি ঘরকে আচ্ছন্ন করেছে। হঠাৎ কেন এ বিপর্যয়, এর দায় কাদের ? এ নিয়ে চলছে চুরচেড়া বিশ্লেষণ।
এক কথায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফল বিপর্যয় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুনভাবে ভাবনার সৃষ্টি করছে। এ বিপর্যয় শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষেত্রে নয়, বরং জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। পাশের হার কমে যাওয়ার কারণ হিসাবে বোর্ডগুলো হয়তো উত্তরপত্র মূল্যায়নে কড়াকড়ি, কঠিন প্রশ্নপত্র বা পরিবর্তিত শিক্ষাক্রমকে দায়ী করবে। তবে প্রকৃত কারণ সম্ভবত আরও গভীরে প্রেথিত। শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি আর আবরার যেমনটা বলেছেন, ‘বাংলাদেশে শেখার সংকট শুরু হয় শিক্ষার শুরুর দিকেই। প্রাথমিক স্তর থেকেই শেখার ঘাটতি তৈরি হয় এবং সেই ঘাটতি বছরের পর বছর সঞ্চিত হয়। কিন্তু আমরা দীর্ঘদিন এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে চাইনি। আমরা এমন এক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছি, যেখানে সংখ্যাই সত্য হয়ে উঠেছিল, পাশের হারই ছিল সাফল্যের প্রতীক, জিপিএ-৫-এর সংখ্যা ছিল তৃপ্তির মানদন্ড। ফল ভালো দেখাতে গিয়ে আমরা অজান্তেই শেখার প্রকৃত সংকট আড়াল করেছি। আজ আমি সেই সংস্কৃতির পরিবর্তন চাই।’ শিক্ষা উপদেষ্টার এ বক্তব্য যথার্থ তবে, এবারের প্রেক্ষপাটে কিছু ভিন্নতা আছে। বস্তুত ফলাফলের এই বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কারণ শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতি। বিশেষ করে, ২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের যে শ্রেণি বিমুখতা তা এখনও অব্যাহত আছে। এবার যারা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে তাদের অধিকাংশই ২০২৪ এর একাদশের শিক্ষার্থী ছিল। এরাই আন্দোলনের বড় শক্তি ছিল। এছাড়া গ্রামে, নিম্নাঞ্চল, হাউড় ও পাহাড়ি অঞ্চলে দক্ষ শিক্ষক না থাকায় মানসম্মত পাঠদানের সংকট তো আছেই সেই সাথে পর্যাপ্তসংখ্যক যোগ্য শিক্ষক না থাকা, বিশেষত গ্রামীণ ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে ঘাটতি-এ সবকিছুই ফল বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনার দাবি রাখে। ফলাফলের এই চিত্র একইসঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থায় বিরাজমান বৈষম্যেরও স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফলের মধ্যে পার্থক্য এখনো ব্যাপক।
কাজেই শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের উচিত এই ফলকে একটি সতর্কতা হিসাবে নেওয়া। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, পরীক্ষার পদ্ধতির যথার্থতা যাচাই এবং বৈষম্য দূরীকরণে সুদূরপ্রসারী ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। বিশ্ববিদ্যালয়সহ মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তির ক্ষেত্রেও শুধু জিপিএ-৫-এর ওপর নির্ভর না করে সার্বিক মেধা ও দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেয়া উচিত। নয়তো এই ফল শুধু একটি পরিসংখ্যান হয়েই থাকবে, যার গভীর প্রভাব সমাজ ও জাতিকে বহন করতে হবে। এছাড়া এ ফল বিপর্যয়ের ফলে ঝরেপরা শিক্ষার্থীদের তালিকাও দীর্ঘ হতে পারে, পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে শিক্ষার্থী সংকটও প্রকট হতে পারে, এতে বড় ধরণের আর্থিক সমস্যায় পড়তে পারে অনেক উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যা সমাজ ও রাষ্ট্রে বিরোপ প্রভাব ফেলতে পারে।
পরীক্ষায় যারা কৃতকার্য হয়েছে, ভালো ফল অর্জন করেছে, তাদের জন্য রইল আমাদের প্রাণঢালা অভিনন্দন। তাদের এই সাফল্য কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং সঠিক দিকনির্দেশনার ফসল। তাদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পথ আরও মসৃণ হবে এবং তারা দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস। আর যারা কাক্সিক্ষত ফল অর্জন করতে পারেনি, তাদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। এই পরীক্ষার ফলই জীবনের শেষ কথা নয়। তাদের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো আত্মবিশ্বাস ধরে রেখে পুনরায় প্রস্তুতি নেওয়া এবং ভবিষ্যতের জন্য সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা। মনে রাখতে হবে, জীবনে সফল হওয়ার জন্য ভালো ফলের চেয়েও বেশি প্রয়োজন হলো সততা, দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং হার না মানার মানসিকতা। সপল মানুষের যাপিত জীবন কিন্তু তাই বলে। এছাড়া সরকারের উচিৎ শিক্ষা ব্যবস্থাকে আর গিনিপিক না বানিয়ে একটি স্থিতি অবস্থায় নিয়ে আসা। একটি আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞান সম্মত ও প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি।