কোয়ান্টামে বাজিমাত

1

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

[ গতকালের বাকী অংশ ]
আমদের পদক্ষেপগুলো এমন হওয়া উচিত যেন ২০৪১-এর আগে আমরা উন্নত দেশে রূপান্তর হতে পারি । মেল্টিং সেকশনে সর্বাধুনিক কোয়ান্টাম আর্ক ফার্নেসে সর্বোচ্চ বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করে বিলেট উৎপাদনের পাশাপাশি বিদ্যুতের সাশ্রয়ী ব্যবহার, সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে উৎপাদনে ব্যবহার, পানি ও বায়ু পরিশোধনসহ বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে কারখানাটিকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। জিপিএইচ ইস্পাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, যাঁকে প্রতিষ্ঠানটির প্রাণপুরুষই বলতে হয়, তাঁর বক্তব্য হলোÑ‘আমরা কত উৎপাদন সক্ষমতার নতুন কারখানা করব, সেটি এখনো চ‚ড়ান্ত করিনি। অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পরই বিস্তারিত পরিকল্পনায় যাব।’ জিপিএইচ কোয়ান্টামের উচ্চশক্তির রড নিয়ে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, উচ্চশক্তির রড ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে পরিমাণগতভাবে রডের ব্যবহার কমানো সম্ভব। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির মতো প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা হবে। সেই সঙ্গে দেশের অর্থনীতি হবে আরও মজবুত।

পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা : জিপিএইচ-এর কারখানায় মেল্টিং সেকশনে কোয়ান্টাম আর্ক ফার্নেসে উৎপাদন চলছে। দৈত্যকার সেই চুল্লির বেশ কয়েক ফুট দূর দিয়ে যাওয়ার সময় আগুনের উত্তাপ গায়ে লাগে। তারপর ল্যাডেল রিফাইনিং ফার্নেস পেরিয়ে কনটিনিয়াস কাস্টিং মেশিনে বিলেট উৎপাদনের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। উৎপাদিত বিলেট সরাসরি রোলিং মিলে পাঠানো হয়। বিলেট উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় কিছু তাপমাত্রা হারায়। তখন রি হিটিং ফার্নেস বা ইন্ডাকশন হিটারে উত্তপ্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রোলিং মেশিনে রোলিং করা শুরু হয়। একের পর এক মেশিনের ভেতরে রোল হয়ে শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট আকৃতির রড আকারে বের হয়। সেই রড কুলিং বেডে শীতল করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাঁধাই করা হয়। তারপর চুম্বকযুক্ত বিশাল ক্রেন দিয়ে ট্রাকে তোলা হয়। কারখানাটিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে কার্বন নিঃসরণ খুবই কম। রড উৎপাদনে প্রচুর পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয়। আর সীতাকুন্ডে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর খুবই নিচে। ভ‚গর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে পাশের পাহাড়ি এলাকায় বিশাল আধার বা ড্যাম গড়ে তুলেছে জিপিএইচ ইস্পাত।
২০০৬ খ্রিস্টাব্দে ১৭ মে জিপিএইচ ইস্পাত প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে কার্যক্রম শুরু করে। এটি ২০১২ খ্রিস্টাব্দে একটি পাবলিক লিমিটেড সংস্থা হিসাবে তালিকাভুক্ত হয়। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে তার সম্প্রসারণ প্রকল্প শুরু করে। সংস্থাটি ৮ লক্ষ মেট্রিক টন বার্ষিক ক্ষমতার ইস্পাত কারখানার জন্য প্রায় ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে। জিপিএইচ তার সম্প্রসারণ প্রকল্পের জন্য ১২টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১৫৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ সংগ্রহ করেছে। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানিটি প্রাইমট্যালস টেকনোলজিস, সিমেন্স ভিএআই এবং মিৎসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড পার্টনারদের যৌথ উদ্যোগের সহযোগিতায় সীতাকুন্ড, চট্টগ্রামে তার সম্প্রসারণ প্রকল্প শুরু করে। কোম্পানিটি ০.৮ গঞচণ ইস্পাত উৎপাদন সুবিধার জন্য প্রায় ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। নতুন মিলটি একটি কোয়ান্টাম বৈদ্যুতিক আর্ক ফার্নেস, একটি ল্যাডেল ফার্নেস, একটি থ্রি-স্ট্র্যান্ড, উচ্চ-গতির অবিচ্ছিন্ন বিলেট কাস্টার এবং একটি বার এবং সেকশন মিল ব্যবহার করে। এটি বিশ্বে প্রথমবারের মতো রোলিং মিলের জন্য ডরহখরহশ ঋষবী প্রযুক্তি ব্যবহার করে। কোম্পানি ১২টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি পুঁজিবাজার এবং সম্প্রসারণ প্রকল্পের জন্য কোম্পানির রক্ষিত আয়ের মাধ্যমে মোট টঝ$১৫৪ মিলিয়ন সংগ্রহ করেছে। এটি তার পুরনো ইস্পাত কারখানার পাশে নতুন কারখানার জন্য ৮.৮৫ একর জমি কিনেছে। এটি জার্মানির ঙউউঙ ইঐঋ ব্যাংক থেকে $৯৫ মিলিয়ন এবং বিশ্বব্যাংক থেকে $৪৪.২ মিলিয়ন মেয়াদী ঋণ সংগ্রহ করেছে, যা বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্ত¡াবধানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলির মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছিল। এটি সেপ্টেম্বর ২০২০ থেকে স্থানীয় এবং বিদেশী বাজারে তার নতুন প্ল্যান্টের পণ্য বিক্রি শুরু করছে। ২০২৩ এবং ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানিটি অ্যাসপায়ার টু ইনোভেট (ধ২র) এর সহযোগিতায় বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরাম কর্তৃক আয়োজিত দায়িত্বশীল উৎপাদন ও ব্যবহার বিভাগে ঝউএ ব্র্যান্ড চ্যাম্পিয়ন পুরস্কার” অর্জন করে। ২০২৪ সালের আগস্টে, কোম্পানিটি উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ২৪২ কোটি টাকা সংগ্রহের জন্য রাইট শেয়ার ইস্যু করার পরিকল্পনা ঘোষণা করে। জিপিএইচ ইস্পাতে ঘণ্টায় ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। এর বড় অংশ জাতীয় গ্রিড থেকে নেওয়া হলেও কারখানার মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১২ মেগাওয়াট উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া ৬ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে জিপিএইচ রিনিউবল পাওয়ার প্ল্যান্ট। সেটি কিনে নেয় জিপিএইচ ইস্পাত। এ ছাড়া কার্বন ক্রেডিটের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের একটি প্রতিষ্ঠান সেই বিদ্যুতের দাম দিচ্ছে মাসে ২০ লাখ ডলার। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জিপিএইচের চুক্তি চার বছরের। রডের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে জিপিএইচ ইস্পাত। রডের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ১৮ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার লাগবে। এর মধ্যে ১৫ কোটি ডলার হংকং স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে সংগ্রহ করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। বাকি অর্থের যোগান আসবে কোম্পানির পুঞ্জীভ‚ত মুনাফা বা রিটেইনড আর্নিংস থেকে।

দেশ ও জনগণের সেবায় জিপিএইচ : জিপিএইচ শুধু ইস্পাত তৈরি করে না, দেশ গঠন এবং সমাজ উন্নয়নেও অবদান রাখার মাধ্যমে ইতিমধ্যে সুধীজনের প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। জিপিএইচের উৎপাদিত রড, বিলেট ইত্যাদি দেশের অবকাঠোমো উন্নয়নের মাধ্যমে দেশ গঠনে অবদান রাখছে, অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে। সিএসআর অ্যাক্টিভিটির মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তার, প্রতিভা অন্বেষণ, ক্রীড়া, বিনোদন এবং দুঃস্থ ও আর্তমানবতার সেবায় তার সাধ্যমত কাজ করে যাচ্ছে। করোনার অতিমারীর ন্যায় বৈশ্বিক ও দৈশিক সংকটে অক্সিজেন সরবরাহ করে মানবতার ত্রাণে ভ‚মিকা রাখার চেষ্টা করেছে জিপিএইচ। করোনা মহামারীর ক্রান্তিলগ্নে যখন বাংলাদেশে হাহাকার চলছিল, জীবন সঞ্জীবনী অক্সিজেনের জন্য এমন সংকটকালীন সময়ে বিনামূল্যে দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল, উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে, মা ও শিশু হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতাল, ফিল্ড হাসপাতাল, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, মুন্সীগঞ্জ জেলা এবং উপজেলায় অক্সিজেন সিলিন্ডার বিতরণ করেছে জিপিএইচ ইস্পাত। করোনাকালীন সময়ে জিপিএইচ সারা বাংলাদেশের প্রায় ৮০,০০০ অক্সিজেন সিলিন্ডার বিনামূল্যে রিফিলসেবাসহ বিতরণ করেছে। দেশের সাংবাদিকতার একজন কিংবদন্তী, জ্যেষ্ঠতম সম্পাদক, চট্টগ্রামের প্রাচীনতম দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক ‘একুশে পদক’ লাভ করায় ২০২২ খ্রিস্টাব্দের ১ এপ্রিল রেডিসন ব্লু হোটেলে জিপিএইচ পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর সম্মানে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ২৮ মার্চ ২০২২ খ্রিস্টাব্দে জিপিএইচ ইস্পাত তাদের কর্মকর্তাদের সন্তানদের জন্য চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডস্থ কুমিরা অফিসে ‘ভবিষ্যত বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক চিত্রাংকন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের সীতাকুন্ডর কুমিরাস্থ প্ল্যান্ট ও তার পার্শ্ববতী এলাকার মহিলাদের জন্য দিনব্যাপী চিকিৎসা ক্যাম্প করে। এতে আশাপাশের গ্রামের কয়েক’শ দরিদ্র মহিলাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ প্রদান করা হয়। এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করে জিপিএইচ ইস্পাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জিপিএইচ প্রথমবারে মত মহিলাদের জন্য ফ্রি চিকিৎসা ক্যাম্পের আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানে জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলমাস শিমুল বলেন, মানুষের সেবায় সব সময়ই জিপিএইচ কাজ করে চলেছে। ২০২২ খ্রিস্টাব্দের ২২ সেপ্টেম্বর ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে চট্টগ্রাম রেডিসন ব্লু হোটেলে জিপিএইচ ইস্পাত মিট দ্যা ডেভেলপমেন্ট মাস্টারমাইন্ডস ২০২২ অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় ১৭৪ জন প্রকৌশলী অংশ নেন।
লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক