নিজস্ব প্রতিবেদক
খাগড়াছড়িতে চেঙ্গী ও মাইনী নদীর প্রাণ ফেরাতে ৫৮৬ কোটি টাকার মেগাপ্রকল্প হাতে নেয় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। ২০২২ সালে অনুমোদন হওয়া প্রকল্পটির অগ্রগতি মাত্র ৩৭ শতাংশ। ইতোমধ্যে প্রকল্পটি ঘিরে নানামুখী বিপত্তি বেড়েছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর সামাজিক সমস্যা, ঠিকাদারদের গাফিলতি, বালু সংকটসহ নানা কারণে পিছিয়ে পড়া প্রকল্পটি ঘিরে অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পাহাড়ের প্রথম মেগাপ্রকল্পটির অনিয়ম নিয়ে সংস্থাটি ব্যাপক তৎপর রয়েছে।
রাঙামাটি দুদকের সহকারী পরিচালক আহমদ ফরহাদ হোসেন পূর্বদেশকে বলেন, ‘খাগড়াছড়ির পাউবোর প্রকল্পের অনুসন্ধান চলছে। প্রকল্পের সাথে বিভিন্নভাবে যারাই সম্পৃক্ত ছিল সবার বক্তব্য নেয়া হচ্ছে। এরমধ্যে টেন্ডার প্রক্রিয়া চালানো সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলীকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। প্রকল্পের কারিগরি এক্সপার্টদের বক্তব্য নেয়া হচ্ছে। এরপরেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে’।
দুদক সূত্র জানায় জানায়, খাগড়াছড়িতে চলমান পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পটির অনিয়ম নিয়ে এনফোর্সমেন্ট অভিযান চলাকালে দুদকের টিম স্থানীয়দের সাথে কথা বলেন। এসময় লংগদুতে মাইনী নদীর মুখে ড্রেজিংয়ের মাটি দিয়ে কাপ্তাই হ্রদ ভরাটের প্রমাণ পায় দুদক। এছাড়াও প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ঠিকাদার নিয়োগ নিয়ে বড় ধরনের অসঙ্গতি ছিল। ড্রেজিংয়ের নামে প্রকল্প অর্থ তছরুপ হয়েছে বলেই দুদকের কাছে প্রতিয়মান হয়। যে কারণে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে দুদক। গত ১৪ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি প্রকল্পের পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী ড. তানজীর সাইফ আহমেদ, আইডবিøউএমের পরিচালক রুবাইয়াত আলম, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুর রহমান, রামগড় পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী দিবাংশু চাকমা, নিকেল চাকমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গত ৭ অক্টোবর চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড-২ এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদুজ্জামান খানকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে লক্ষীপুরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আছেন। যদিও গত ৫ অক্টোবর দুদকের তলবের বিষয়ে জানতে চাইলে লক্ষীপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদুজ্জামান খান বলেন, ‘দুদকের তলবের বিষয়টি আমার জানা নেই’।
পাউবো সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদুজ্জামান খান। মূলত এই কর্মকর্তা চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড-২ এর দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সেসময় অনন্ত বিকাশ ত্রিপুরা, সেলিম অ্যান্ড ব্রাদার্স, আলম অ্যান্ড ব্রাদার্সসহ বেশ কয়েকজন পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেয়া হয়। পরে এসব ঠিকাদারের মধ্যে অনন্ত বিকাশ ত্রিপুরা ও সেলিম অ্যান্ড ব্রাদার্স নানাভাবে স্থানীয়দের ম্যানেজ করে প্রকল্প কাজ এগিয়ে নিলেও ইতোমধ্যে অন্য ঠিকাদারদের কাজ কয়েকদফা হাত বদল হয়েছে। সেসময় টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নিয়মনীতি অনুসরণ হয়েছে কিনা সেসব বিষয় খতিয়ে দেখছে দুদক।
জানা যায়, খাগড়াছড়ি জেলা ও দীঘিনালা উপজেলায় অবস্থিত জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, জনবসতি, ফসলি জমি এবং বনজ সম্পদগুলোকে ভাঙন হতে রক্ষা করা, ঝড়, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, ভ‚মিধস ও পাহাড়ি ঢলের কারণে নদীর তলদেশ ক্রমাগত ভরাট হওয়া বন্ধকরণ, নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা ও নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ভূ-উপরিস্থ পানিনির্ভর সেচ সুবিধা বৃদ্ধি ও ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর পুনর্ভরনে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলার খাগড়াছড়ি সদর, পানছড়ি, দীঘিনালা, মহলছড়ি, গুইমারা, নানিয়ারচর ও লংগদু উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে।
৫৮৬ কোটি টাকার এ প্রকল্পে ইতোমধ্যে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। গত বছর রাজনৈতিক অস্থিরতায় কাজ বন্ধ থাকায় প্রায় ৫০ কোটি টাকা ফেরত গেছে। ইতোমধ্যে ১০ দশমিক ৮১৫ কিলোমিটার নদীর তীর প্রতিরক্ষা ব্লক তৈরি, চেঙ্গী নদীতে ৩৪ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার এবং মাইনী নদী ২৩ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ড্রেজিং রয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় তীর প্রতিরক্ষা প্যাকেজ ৩৫টি, ড্রেজিং ৫টি, চর অপসারণ ২টি, মেইনটেনেন্স ড্রেজিং ২টি এবং বনায়ন রয়েছে ১টি। ব্লকের কাজ সব ২০২৬ এর ভেতর শেষ হবে। চেঙ্গী ও মাইনী নদীর ড্রেজিং কাজও চলমান আছে। চর অপসারণে দু’টি প্যাকেজের সাতটি লটের নতুন করে টেন্ডার হয়েছে। এরমধ্যে চেঙ্গী নদীর চারটি লটের তিনটিতে ওয়ার্ক অর্ডার দেয়া হয়েছে। মাইনী নদীর তিনটির ওয়ার্ক অর্ডার এখনো দেয়া হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. তানজীর সাইফ আহমেদ পূর্বদেশকে বলেন, ‘পাহাড়ের নানাবিধ কারণে প্রকল্পটি পিছিয়ে পড়েছে। যে কারণে আমরা এই প্রকল্পে কাউকে দোষারোপ করছি না। ইতোমধ্যে প্রকল্পের কিছু বিষয়ে জানতে দুদক আমাদেরকে ডেকেছিল। আমি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ছিলাম না। আমি যোগদানের পর যা কাজ করেছি সবগুলো তথ্য উনাদের দিয়েছি। দুদক আমাদেরকে যেটা জানালো সেটা হচ্ছে, উনারা নিজেদের মতো করে আবার প্রকল্পটি পরিমাপ করবে। এর মধ্যে গত সপ্তাহে মন্ত্রণালয়ে প্রকল্পটির ডিপিপি সংশোধন প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে’।






