মশা-মাছির কথোপকথন

4

হাফিজুর রহমান

বাইরে প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছিল। বৃষ্টির সাথে বাতাসও ছিল। এমনই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় বাইরে বেরুনো মোটেও নিরাপদ ছিল না। এতে জীবনের ঝুকি আছে ভীষণ।
সময়টা ঠিক দুপুর বেলা, ছাদের কাছাকাছি ঘরের কোনার দেয়ালে বসে একটি মাছি ও একটি মশা বিভিন্ন ধরনের গল্পে মজে গিয়েছিল। বৃষ্টি ও বাতাসের কারণে বাইরে বেড়ুতে না পারায়, গল্পগুজবে সময় কাটানোর এটাই ছিল সহজ উপায়। মাছি – তুমি কি ভূত দেখেছ? মশা – হ্যাঁ-, কত দেখেছি।
মাছি – মিছে কথা। ভূত বলতে কিছু নেই।
মশা – তুমি ভূত কখনও দেখতে পাওনি, তাই তোমার এরকমই ধারণা। ভূত আছে, আমি প্রতিরাতেই দেখতে পাই। অবশ্য – তোমাকে বিশ্বাস করানো কঠিন, কারণ আলো ছাড়া তো তুমি আবার রাতে দেখতে পাও না। ওদিকে আবার ভূত কখনও আলোয় আসে না। তুমি তাহলে দেখবে কীভাবে?
মাছি – ভূতের রক্ত খেয়েছো? মশা – ভূতের তো রক্তই নেই, খাব কীভাবে? হো হো করে হেসে উঠলো মাছি! বললো, বলে কী! রক্ত ছাড়া আবার ভূত হয় নাকি?
মশা – হয়, হয়। তুমি অবুজ বলেই হাসছ হে বোকা মাছি। ভূত তো দেখনি, তাই হাসছো বোকার মতো।
মাছি – তাহলে বলো শুনি, ভূত আসলে দেখতে কেমন, আর ওরা খায় কী? মশা – ভূত দেখতে আসলে মানুষের মতো নয়। ভূত, মানুষ আকৃতির একেকটা ছায়া।
এদের প্রধান খাবার হলো কেঁচো। জানো? ভূতদের জীবনযাপন ভীষণ কষ্টের। অলোর অত্যাচারে ওরা কোথাও স্থির হয়ে থাকতে পারে না, সারাক্ষণ ছুটাছুটি করে ঘুরে বেড়ায়। ভূতের গায়ে সামান্য আলো পড়লেই, ওদের গা ভীষণ জ্বালা করে। ভূতেরা ভয় পায় চাঁদ, সূর্য, আকাশের তারা, এমনকি জোনাকি পোকা পর্যন্ত। সব ধরনের আলো ওদেরকে দিনে রাতে তাড়া করে, আর ওরা পালিয়ে বেড়ায় শুধুমাত্র আলোর ভয়ে। তুলনামূলক ভাবে গভীর রাতের অন্ধকার, ওদের জন্যে কিছুটা সময়ের হলেও স্বস্তির।
মাছি – বলো কী! তাহলে ভূতকে মানুষ ভয় পায় কেন? মশা – মানুষ অযথা ভূতকে ভয় পায়। ভূত কখনই কোন ভালো মানুষের ক্ষতি করতে পারে না। ওরা পৃথিবীর শুধুমাত্র দুষ্টু মানুষকে বিভিন্ন রুপে কখনও কখনও ভয় দেখায়, মন্দ কাজ না করে ভালো হওয়ার জন্য। মানুষের উপরে আক্রমণ করে ক্ষতি করার ক্ষমতা, আসলে ভূতদের নেই।
মাছি – বলছো কী! এতোক্ষণে মশার কথার অনেকটাই গুরুত্ব বাড়ে মাছির কাছে। মশার কথাগুলো বিশ্বাস করার মতো। মনে হচ্ছে ভূত সম্পর্কে অনেকিছুই জানে সে। তাই আন্তরিকতার সাথে মশাকে জিজ্ঞাসা করে, তুমি এসব কীভাবে জানলে? ভূতদের জন্মই বা কীভাবে? বলো, আমি জানতে চাই।
মশা – তবে শোন, মশাদের সাথে ভূতদের একটা গভীর সম্পর্ক আছে। মশার কথা শুনে মাছির কপালে উঠে চোখ! অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মুখ বরাবর, শুনতে থাকে মনোযোগ সহকারে।
মাছি – বলো, আমার খুব ভালো লাগছে, ভূত সম্পর্কে জানতে।
মশা – ভূতদের সাথে আমাদের নিয়মিত আলোচনা হয়। ওরা আমাদেরকে খুব বিশ্বাস করে সুখ দুঃখের কথাগুলো শেয়ার করে। পৃথিবীতে যে সমস্ত মানুষ খারাপ কাজ করে, তারাই মরে গেলে ভুত হয়। পৃথিবীর খারাপ মানুষগুলো বেঁচে থাকতে ভালো ভালো খারার খায়, অথচ মরে গিয়ে ভূত হয়, কেঁচো খেয়ে থাকতে হয়। কেঁচো ছাড়া বাইরের অন্য কোন খাবার খাওয়ার, তাদের আসলে ক্ষমতা থাকে না। ক্ষুধার তাড়নায় শাস্তি স্বরূপ কেঁচো খাওয়ার ক্ষমতাটুকুই থাকে শুধু।
পৃথিবীর মানুষগুলোকে ভয় দেখিয়ে ওরা এটাই বুঝাতে চেষ্টা করে, ‘যে তোমারা কোন খারাপ কাজ করিও না। কারও প্রতি অন্যায় অবিচার কর না, সুদ খেও না – ঘুষ নিও না। এসব খারাপ কাজ করলে, মরার পরে আমাদের মতো ভূত হতে হবে। ভূত হওয়াটা খুব কষ্টের, শান্তি বলতে ভূতদের কোন কিছু নেই।’ কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ভূতদের কথা মানুষ শুনতে পারে না, ভূতদের দেয়া বার্তাও বুঝতে পারে না।
যদি বুঝতে পারতো, তাহলে কোন মানুষ কখনও পৃথিবীতে খারাপ কাজ করতে পারতো না, মানুষকে তার বিবেগ, প্রবলভাবে বাধা প্রদান করতো। ভূতদের এই বার্তা, আমরা মশারাও মানুষকে দেয়ার চেষ্টা করি কামড় দিয়ে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, মানুষ আমাদেরও ভাষা বুঝতে পারে না, চাপড়াইয়ে আমাদেরকে মেরে ফেলে অবুঝের মতো। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা মাছি নড়েচড়ে বসল। বললো, ভাই মশা, তোমরা আমাদের থেকে আকারে অনেকটাই ছোট, তবুও আমাদের থেকে দেখছি তোমাদের জ্ঞান – বুদ্ধি অনেক বেশি। তোমরা অনেককিছুরই খবর রাখ, অথচ আমরা এসবের কিছুই জানি। তোমরাও মানুষের মঙ্গলের জন্যে কাজ কর, অথচ সেসব ভাবনাই আমাদের মাথায় নেই। ভাবছি, আমি সমস্ত মাছিদের সাথে আলোচনা করে দেখব, পৃথিবী বা পৃথিবীর মানুষগুলোর ভালোর জন্য আমরাও কিছু করতে পারি কী না। মশা – বেশ তো, সেরকমটা করতে পারলে তো ভালোই হয়। আমরা যা করতে পারছি না, তোমরা করতে পারলে অনেক উপকৃত হতে পারে পৃথিবীর মানুষগুলো। তা – কী ধরনের উদ্যোগ নিতে চাও শুনি? মাছি – হুট করে আর কী বলি। এ বিষয়টির ব্যপারে ব্যপকভাবে চিন্তা ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে এই মূহুর্তে একটা আইডিয়া এসেছে আমার মাথায়, এটি করে দেখা যেতে পারে। মশা – কীরকম সেটা?
মাছি – ভাবছি, সমস্ত মাছিগুলো আমারা যদি এরকম সিদ্ধান্ত নেই, যে মানুষের খোলা রাখা খাবারের উপরে বসে যদি আমারা মল-মুত্র ত্যাগ করি, তবে নিশ্চয়ই ওই খাবারগুলো খেয়ে পেটের পীড়ায় মানুষগুলো অসুস্থ হয়ে পড়বে?
মশা – হ্যাঁ, অসুস্থ হয়ে পড়বে। কিন্তু তাতে কী উপকার হবে মানুষের?
মাছি – এতে করে যা হবে তা হলো, মানুষগুলো আর যেকোনো খাবার খোলামেলা রাখবে না, খাবারে মাছি বসে মল-মুত্র ত্যাগ করলে, সেই সব খাবার খেয়ে অসুস্থ হওয়ার ভয়ে।
মশা, – হ্যাঁ, তা না হয় ঠিক বুঝলাম, কিন্তু উপকার কীভাবে হবে? তা তো বুঝতে পারছি না।
মাছি – মানুষ যদি মাছি বসার ভয়ে খাবারগুলো ঢেকে রেখে খায়, তবে নিশ্চয়ই ভালো থাকবে, অসুস্থ হয়ে পড়বে না। এতে করে খোলা রাখা খাবার না খাওয়ার একটা শৃঙ্খলা ফিরে আসবে মানুষের। বুঝতে পারবে কোনটা ঠিক আর কোনটা ঠিক নয়। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্র থেকে মানুষ শিক্ষা নিতে পারলে, নিশ্চয়ই একদিন বুঝতে পারবে, আমরা কী বলতে চাই, কীরকমের আমাদের বলার ভাষা। মশা – বাহ্, দারুণ পরিকল্পনা। বেশ তোমরা তাহলে তোমাদের মতো করে চেষ্টা কর, যেন ভালো হয় মানুষের। কোন ধরনের অন্যায় না করে, যেন ভালো হয় পৃথিবীর সকল মানুষ। ভালো থাকুক পৃথিবী, ভালো থাকে যেন পৃথিবীর মানুষগুলো, মরার পরে অন্তত: ভূত না-হওয়ার ভয়ে।