বিচিত্র কুমার
একটা সময় ছিল, যখন বনের সব পাখিরা একসাথে হাসি-খুশিতে থাকতো। তখন না ছিলো কোনো লড়াই, না ছিলো কোনো ঝগড়া। বনের সব পাখি নিজের রঙ ও গানের জন্য গর্ব করতো। প্রত্যেকেই ছিলো বনের রাজ্যের অমূল্য ধন। একদিন, বনের ময়না পাখি হঠাৎ ঘোষণা করল, “আমরা সবাই তো নিজেদের রঙ নিয়েই গর্ব করি! কিন্তু চল, দেখি কার রঙ সবচেয়ে সুন্দর!” বনভর্তি পাখিরা ময়নার কথায় সাড়া দিলো। নানা জাতের পাখি ময়নার ডাকে সাড়া দিয়ে বনের বড় আমগাছের নিচে জড়ো হলো। সেখানে পায়রা, টিয়া, ঘুঘু, কাকাতুয়া, ময়ূর আর কাঠবিড়ালী সবাই জমা হলো। প্রতিযোগিতার জন্য সবাই মিলে একটি রঙ্গিন রাজা বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।
প্রথমে এল ময়ূর। সে তার পেখম মেলে ধরে একেবারে নাচতে শুরু করল। তার পাখার রঙ দেখে বনের সবাই মুগ্ধ! তার রঙিন পেখমে নীল, সবুজ আর সোনালি ঝলকানি ছিল। সকলে সুরে সুরে বলতে লাগলো, “ওহ, ময়ূর! তুমি তো একদম রঙ্গিন রাজা!” এরপর এল টিয়া। টিয়ার সবুজ রঙের গা আর হলদে ঠোঁট দেখে সবাই আবার চমকে উঠল। তার কণ্ঠের মিষ্টি সুর সবাইকে আরো মুগ্ধ করল। কিন্তু তারপর পায়রাও এলো তার ধবধবে সাদা রঙ নিয়ে। পায়রার সাদা রঙ বনের সব রঙিন রঙের মাঝে শান্তির প্রতীক হয়ে ওঠে। এভাবে একে একে সব পাখি নিজেদের রঙ নিয়ে আসতে থাকে। কিন্তু সবশেষে এসে হাজির হলো কাক। কাকের রঙ ছিলো পুরো কালো, অন্যদের মতো রঙিন কিছু নয়। তার গলা থেকে মধুর সুরও বের হতো না। তাই সবাই মিলে তাকে নিয়ে হাসাহাসি শুরু করল। কাককে বলল, “তোমার মধ্যে তো কোনো রঙ নেই, কাক ভাই! তোমাকে এই প্রতিযোগিতায় রাজা হতে হবে না।” কাক মনে খুব কষ্ট পেল। সে এক কোণায় গিয়ে বসে রইল। তার নিজের ওপর থেকে বিশ্বাস উঠে গেল। সে ভাবতে লাগল, “কেন আমার রঙ কালো হলো? আমি কি সত্যি কোনো কাজে আসি না?” তখনই হঠাৎ করে শুরু হলো ঝড়। বন কাঁপিয়ে উঠলো প্রচন্ড বাতাস আর বজ্রপাত। সব পাখি আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করল। ঝড়ের আঘাতে ময়ূরের পেখম ছিঁড়ে গেল, টিয়ার সবুজ পাখা ধূলায় মিশে গেল, আর পায়রার সাদা রঙ মাটির সঙ্গে মিশে মলিন হয়ে গেল। ঝড় শেষ হতে একটু একটু করে বৃষ্টি শুরু হলো। তখন কাক বুঝল যে এই ঝড়ের পর একমাত্র সে-ই উড়তে পারবে। সে সাহস নিয়ে একে একে সবার কাছে গিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলো। ঝড় থামার পর, কাক তার শক্ত ডানা দিয়ে সবাইকে গাছের নিচে এনে আশ্রয় দিলো। তার কালো ডানার ছায়ায় সবার ঠান্ডা লাগা কমে গেল। সবাই তখন বুঝল যে শুধু বাহ্যিক রঙে নয়, সত্যিকারের মূল্য তো আত্মার শক্তিতেই। ময়না কাকের কাছে গিয়ে বলল, “কাক ভাই, তোমার রঙ কালো বলে আমরা তোমাকে অবহেলা করেছি, কিন্তু আজ তুমি আমাদের সবাইকে বাঁচিয়েছো। আসল রঙ তো বাহ্যিক নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে থাকে।” এইভাবে সবাই মিলে কাককে তাদের ‘রঙিন রাজা’ ঘোষণা করল। কারণ সে প্রমাণ করে দিলো, আসল সৌন্দর্য রঙে নয়, বরং চরিত্রে আর কাজে থাকে। এই গল্পের শিক্ষা হলো, বাহ্যিক সৌন্দর্য্যরে চাইতে অন্তরের গুণগুলোই আসল পরিচয়।


