
ফখরুল ইসলাম নোমানী
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)বলেন রাসুলুল্লাহ (সা.) কে আমি বলতে শুনেছি তিনি এরশাদ করেন তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল আর সবাই তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে। ইমাম তথা জনতার নেতা একজন দায়িত্বশীল তিনি তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। পুরুষ দায়িত্বশীল তার পরিবারের সে জিজ্ঞাসিত হবে তার দায়িত্ব সম্পর্কে। স্ত্রী দায়িত্বশীল তার স্বামীর গৃহ ও সন্তানের সে জিজ্ঞাসিত হবে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে। মানুষের (দাস) ভৃত্য দায়িত্বশীল মুনিবের সম্পদের সে জিজ্ঞাসিত হবে তার মুনিবের সম্পদ সম্পর্কে। অতএব সতর্ক থেকো তোমরা সবাই দায়িত্বশীল আর সবাই জিজ্ঞাসিত হবে নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে। আপনি একজন পিতা বা অভিভাবক হিসেবে আপনার সন্তানের ব্যাপারে কতটা দায়িত্বশীল তা ভেবে দেখুন। শুধু তাদের অন্ন-বস্ত্রের জোগান দেওয়াই শুধু আপনার দায়িত্ব নয়, তাদের সুশিক্ষা দেওয়া ইসলামের প্রয়োজনীয় জ্ঞান শেখানো এবং ইসলামি মূল্যবোধ ও শিষ্টাচারের ওপর তাদের গড়ে তোলাও আপনার দায়িত্ব। আজকাল অনেক বাবা-মাই মনে করেন সন্তানের খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা পর্যন্তই তাদের দায়িত্ব সীমিত। কখনো খেলাধুলা ও বস্তুগত আরও কিছুকে এর সঙ্গে যোগ করা হয়। অথচ তারা তাদের সার্বিক কল্যাণ বয়ে আনতে পারেন না। কারণ তাদের গুরুত্বের সবটুকু জুড়ে থাকে শারীরিক প্রতিপালন কখনো বুদ্ধি বৃত্তিক লালনকেও এর সঙ্গে যোগ করা হয়। তবে রুহ তথা আত্মার খোরাক সম্পর্কে উদাসীনতা দেখানো হয়। অথচ বাস্তবে মানুষ প্রথমে রুহ, তারপর বুদ্ধি, অতঃপর দেহ। বলা বাহুল্য রুহের খোরাক হলো ইসলামি শিক্ষা।
সন্তানকে দুনিয়াদারির সঙ্গে সঙ্গে আখেরাতের পস্তুতির শিক্ষা দিতে হবে। জাগতিক সব শিক্ষা-দীক্ষার পাশাপাশি পারলৌকিক জ্ঞানও দিতে হবে। শরিয়তের যাবতীয় হুকুম-আহকামের জ্ঞান শেখাতে হবে। শুধু ধারণা দেওয়াই যথেষ্ট নয় সার্বিক তত্ত¡াবধানের মাধ্যমে তার অনুশীলনও করাতে হবে। মৌলিক দ্বীনি জ্ঞান এবং আমল-ইবাদত শেখাতে হবে। আর ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক চর্চিত আমল হলো নামাজ। সন্তানকে তাই নামাজ আদায় শেখাতে হবে। শিক্ষা দিতে হবে নামাজের প্রয়োজনীয় জ্ঞান। কোরআন শিক্ষা দেওয়া, হালাল-হারামের জ্ঞান, আল্লাহ-রাসুলের প্রতি বিশ্বাস ইত্যাদি শেখানোও অপরিহার্য। হয় আপনি শেখাবেন নয়তো মাদরাসায় পড়িয়ে কিংবা সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগে ধর্মীয় শিক্ষকের মাধ্যমে শেখাতে হবে। কারণ একজন মুসলিমের জন্য যে কাজগুলো ফরজ তা করার জন্য এবং যে কাজ গুলো হারাম তা থেকে বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন ফরজ। আনাস ইবনে মালিক (রা.)বলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)বলেছেন জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।
একজন মুসলিম হিসেবে আমরা সন্তানকে বুদ্ধি বিকাশের প্রথম প্রহরেই দ্বীন সম্পর্কে ধারণা দিতে ইচ্ছুক থাকি। সন্তান কথা বলা শুরু করতেই আমরা অনেকে আল্লাহ, আব্বু-আম্মু শিক্ষা দিই। কালেমায়ে শাহাদাত শেখাই। তারপর ক্রমেই তাকে নামাজ, রোজা ইত্যাদি ইবাদতের সঙ্গে পরিচিত করাই। কিন্তু যে কাজটি আমরা করি না তা হলো সন্তানকে শুধু কালেমা শেখানোই নয় তাকে তাওহিদ শিক্ষা দেওয়া ঈমানের মোটামুটি বিস্তারিত শিক্ষা দেওয়া এবং তাওহিদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক দিকগুলো সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। জুনদুব বিন আবদুল্লাহ (রা.)বলেন আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)এর সঙ্গে থাকতাম। তখন আমরা টগবগে যুবক ছিলাম। সে সময় আমরা ঈমান শিখি আমাদের কোরআন শেখার আগে। এরপর আমরা কোরআন শিখি। এতে করে আমাদের ঈমান বেড়ে যায় বহুগুণে। সন্তান যখন আধো আধো ভাষায় অস্ফুট কণ্ঠে কথা বলতে শুরু করে প্রথম যখন তার বাক প্রতিভার অভিষেক ঘটে তখন ঈমানের শাখাগুলোর মধ্যে প্রথম ও সর্বোচ্চটি তথা ‘লা ইলাহা ইল্লালাহ’ শেখানোর চেষ্টা করা উচিত। আমাদের ভেবে দেখা দরকার নিজ সন্তানকে আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি। কোথায় আমরা আর কোথায় রাসুলুল্লাহ (সা.)এর সাহাবি? কোথায় তাদের সন্তান আর কোথায় আমাদের সন্তান? সুতরাং যাকে আল্লাহ হিদায়েত করতে চান ইসলামের জন্য তার বুক উন্মুক্ত করে দেন। আর যাকে ভ্রষ্ট করতে চান তার বুক সঙ্কীর্ণ-সঙ্কুচিত করে দেন যেন সে আসমানে আরোহণ করছে। এমনিভাবে আল্লাহ কল্যাণ দেন তাদের ওপর যারা ঈমান আনে না। (সুরা আনআম : ১২৫)
আজকাল আমরা ভালো চাকরি আর বিপুল আয়-রোজগারকেই সন্তানদের শিক্ষা ও জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানিয়ে দিচ্ছি। অথচ আমাদের যে পরকালীন একটি জীবন আছে যার শুরু আছে অথচ শেষ নেই, যেখানে হবে আমাদের প্রতিটি কর্র্মের হিসাব-নিকাশ সেদিকে যেন কোনো ভ্রূক্ষেপই নেই। থাকলে আমরা সন্তানদের জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে এই বিষয়টিও বিবেচনায় নিতাম। মুসলিম মাতা-পিতার অন্যতম দ্বিনি দায়িত্ব হলো সন্তানকে দ্বিনি শিক্ষায় শিক্ষিত করা। কেননা মুসলিম হিসেবে জীবন যাপন করার জন্য ধর্মীয় জ্ঞান ও শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। দ্বিনি শিক্ষার অভাবে বর্তমান সমাজের বহু মুসলমানকে ঈমান ও ইসলাম থেকে বিমুখ হয়ে যেতে দেখা যায়। বর্তমান সমাজের সাধারণ চিত্র হলো সমাজের বেশির ভাগ মুসলমান তাদের সন্তানদের শুধু জাগতিক শিক্ষা প্রদান করে। জাগতিক শিক্ষায় সর্বোচ্চ অর্জন নিশ্চিত করতে প্রচুর অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে। তারা তাদের সন্তানদের নামি-দামি স্কুলে পড়ায়। তাদের জন্য হাজার হাজার টাকা দিয়ে গৃহশিক্ষকের ব্যবস্থা করে। বিপরীতে সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা ও তারবিয়তের ব্যাপারে তাদের উদাসীনতার কোনো শেষ নেই। বর্তমান সমাজের বহু মুসলমানের সন্তান কালেমা বলতে পারে না, তাদের প্রিয় নবী (সা.)এর নাম জানে না অজু-গোসল ও নামাজের বিধান পর্যন্ত তাদের জানা নেই। বিশুদ্ধ কোরআন তিলাওয়াত পারে না (সম্ভবত) ৮০ শতাংশ মুসলিম শিশু ও কিশোর। এমনকি বহু লোক আছে যারা নিজেরা হয়তো নামাজ পড়ে, শুক্রবার হলেও মসজিদে যায়, কিন্তু তারা তাদের বাচ্চাদের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ায়, মিশনারি স্কুলে পড়ায় তাদের সন্তানরা ইংরেজি খুব ভালো বলে, গণিতে-বিজ্ঞানে খুবই দক্ষ হয়ে ওঠে, কিন্তু তারা সঠিকভাবে কালেমা পড়তে পারে না। এসব শিশু এমন সব বিষয়ও জানে না, যা না জানলে ব্যক্তি মুসলিম হতে পারে না, তাদের এমন বিশ্বাস সম্পর্কে জ্ঞান থাকে না, যার ওপর মুসলমানের ঈমান, ইসলাম ও পরকালীন মুক্তি নির্ভরশীল। জাগতিক শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনের পরও তারা নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতের মতো ফরজ ইবাদত সম্পর্কে মৌলিক ও প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো জানে না।
সাধারণত যারা ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করে না কেবল জাগতিক বিদ্যা অর্জন করে তাদের ভেতর যথাযথভাবে মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটে না নিজের পরিবার ও সমাজের প্রতি তাদের কোনো দায় বোধ থাকে না। মাতা-পিতার সীমাহীন আদর-যতেœ বড় হলেও এক সময় তারা মা-বাবাকে পার্থিব লাভ ও ক্ষতির পাল্লা দিয়ে পরিমাপ করে। ফলে তারা অনেক সময় মা-বাবাকে ঠুনকো অজুহাতে দূরে সরিয়ে দেয়, তাঁদের বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে। মা-বাবার স্বপ্ন ও শ্রম তাদের কাছে মূল্যহীন। এখন পর্যন্ত সমাজের বাস্তবতা হলো দ্বিনি শিক্ষায় শিক্ষিতরাই তাদের মা-বাবার প্রতি অনেক বেশি দায়িত্বশীল। তাদের অন্যায়-অপরাধে জড়িয়ে পড়ার হারও অত্যন্ত কম। মুসলমানের পার্থিব ও পরকালীন কল্যাণ এতেই নিহিত যে তারা তাদের সন্তানদের অবশ্যই ধর্মীয় শিক্ষা নিশ্চিত করবে। যদি কেউ তাদের জাগতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চায় তবে তার দায়িত্ব হলো প্রয়োজনীয় ধর্মীয় জ্ঞান নিশ্চিত করা পাশাপাশি তার দ্বিনি তারবিয়্যাত তথা ধর্মীয় শিষ্টাচার ও জীবন যাপনে অভ্যস্ত করা। যেন তার পার্থিব শিক্ষার উদ্দেশ্যও হয় সৎ ও কল্যাণকর। সে যেন তার জীবনের প্রতিটি স্তরে আল্লাহর বিধান মেনে চলা অপরিহার্য মনে করে। মনে রাখতে হবে কিয়ামতের দিন অন্যান্য নিয়ামতের মতো সন্তান সম্পর্কেও আমাদের প্রশ্ন করা হবে। তাদের প্রয়োজনীয় ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের সুযোগ করে না দিলে পরকালে আল্লাহর সামনে লজ্জিত হতে হবে। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)এক ব্যক্তিকে বলেছিলেন তোমার সন্তানকে ভালো শিক্ষায় শিক্ষিত করো (বা উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দাও)। কেননা তোমার সন্তানদের সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞাসা করা হবে যে তুমি তাদের কেমন প্রশিক্ষণ দিয়েছ এবং তুমি তাদের কী শিখিয়েছ ?
সন্তানের দ্বীনি শিক্ষা নিশ্চিত করা প্রত্যেক মুসলিম পিতা-মাতার জন্য একটি অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব কেননা দ্বীনি শিক্ষার অভাব মানুষকে ধর্ম থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং ঈমানের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। মুসলিম হিসেবে জীবন যাপন করার জন্য এই জ্ঞান অপরিহার্য যা একজন সন্তানকে মৃত্যুর পরেও পরকালে সওয়াবের অংশীদার করে যা জাগতিক শিক্ষার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য কোরআন-সুন্নাহের জ্ঞান অর্জন এবং তা বাস্তবে প্রয়োগ করা আবশ্যক যা নিশ্চিত করে যে সন্তান সঠিকভাবে ইবাদত করতে পারবে এবং সব ধরনের মন্দ কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে। অতএব সন্তানদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন পরকালে আল্লাহর সামনে লজ্জিত হতে না হয়। আল্লাহর শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)বলেছেন কোনো পিতা তার সন্তানকে ভালো আদবের চেয়ে ভালো উপহার দেয়নি। শৈশব থেকেই সন্তানদের ঈমান-আমল, আকিদা-বিশ্বাস ও ইসলামী মূল্যবোধসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে একটি আদর্শ ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যথার্থ ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের সন্তানরা সেইসব শিক্ষালয় থেকে ইসলামী শিক্ষা ও চেতনা গ্রহণ করুক সে প্রত্যাশা করি। আল্লাহতাআলা সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষাদীক্ষায় সব মা-বাবাকে আগ্রহী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট






