গ্রাহকদের আমানত সুরক্ষা করতে হবে

1

২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক। এ ব্যাংকগুলো ইসলামী শরীয়ত ভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে পরিচিত। দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকগুলো ও এক্সিম বেশ সুনামের সাথে দেশের আর্থিক খাতে অবদান রেখে আসলেও বিগত কয়েক বছর ধরে ব্যাংকগুলো অব্যবস্থাপনার কারণে বহুমুখী সংকটে পড়েছে। এসংকট আগে তেমন প্রকাশিত না হলেও সরকার পরিবর্তনের পর এ সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব ব্যাংককে গভীর পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়, ব্যাংকগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে এনে একীভূত করার। সর্বশেষ সরকার ইসলামী ব্যাংক পিএলসিকে বাদ দিয়ে উপরোক্ত ব্যাংকসহ গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকসহ মোট পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত চ‚ড়ান্ত করেছে। যদিও এনিয়ে ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারি ও গ্রাহকদের মধ্যে এক ধরণের উত্তেজনা চলে আসছিল। কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যাংকগুলো একিভূত হলে কারো ক্ষতি হবে না। চাকরিও থাকবে, গ্রাহকের আমানতও থাকবে। সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সভায় সংকটে পড়া পাঁচ বেসরকারি ব্যাংক একীভূত করার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। ব্যাংকগুলো হল, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। এসব ব্যাংক নিয়ে এখন নতুন একটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক করার প্রস্তাবও সভায় অনুমোদন হয়। নতুন ব্যাংকের জন্য নাম প্রস্তাব করা হয়েছে দুটি ‘ইউনাইটেড ইসলামিক ব্যাংক’ ও ‘সম্মিলিত ইসলামিক ব্যাংক’। তবে তা চ‚ড়ান্ত করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকটি পরিচালিত হবে বাণিজ্যিকভাবে ও পেশাদারির ভিত্তিতে। বৈঠক শেষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলন করে এ অনুমোদনের কথা জানান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি জানান, ব্যাংকগুলো একীভূত করার ফলে কেউ চাকরি হারাবেন না এবং কোনো আমানতকারী আমানত হারাবেন না। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রাথমিকভাবে নতুন ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন হবে ৪০ হাজার কোটি টাকা ও পরিশোধিত মূলধন হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। পাঁচ ব্যাংকের সব দায় ও সম্পত্তি গ্রহণ করে নতুন ব্যাংকটি তার কার্যক্রম পরিচালনা করবে। পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা সরকার দেবে। এর মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হবে নগদে, আর বাকি ১০ হাজার কোটি টাকা সুকুক বন্ড ছাড়ার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। সুকুক হলো শরিয়াহভিত্তিক একটি ইসলামি বন্ড, যা সুদযুক্ত বন্ডের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ আইনি দলিল বা চুক্তিপত্র। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের শেয়ার দিয়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা মূলধনে রূপান্তর করা হবে বেইল-ইন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। পরে আবার রেজল্যুশন পরিকল্পনা অনুযায়ী তা পরিশোধ করা হবে আমানতকারীদের। যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের ঋণের একাংশ বাতিল হয়ে শেয়ারে রূপান্তরিত হয়, সেটাই হচ্ছে বেইল-ইন। নতুন ব্যাংকটি প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রমালিকানাধীন হবে। পরে পর্যায়ক্রমে মালিকানা বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা হবে। প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘আশা করছি, পাঁচ বছরের মধ্যে ব্যাংকটি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হবে।’ ব্যাংকটি সরকারি খাতে চলে যাওয়ায় গ্রাহকদের আতঙ্ক কমে আসবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি আতঙ্কিত ক্ষুদ্র গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হতে মাসখানেক সময় লাগতে পারে।
একীভূত হওয়ার তালিকায় থাকা সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাফিউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংক খাত তথা আর্থিক খাতের স্বার্থে পাঁচ ব্যাংকের একীভূত হওয়ার পদক্ষেপ একটি উত্তম সিদ্ধান্ত। এতে পাঁচ ব্যাংকের ৯০ লাখ আমানতকারীর স্বার্থ সুরক্ষা পাবে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উচিত হবে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহায়তা করা। উপরোক্ত সরকারি উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্ত এবং পরিকল্পনা যথাযথ বাস্তবায়ন হলে আমরা মনে করি, এটি হবে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আমরা এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই। তবে এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। গ্রাহকদের আমানত সুরক্ষার বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে।