চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমিকা আশাব্যঞ্জক

2

বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের আমলে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে দেশের এক বিরাট অংকের সম্পত্তি অবৈধ ভাবে দখল করে নিয়েছে বিশেষ বিশেষ শ্রেণি। দেশে বিভিন্ন জেলায় এরকম অবৈধ দখলদারের অভাব নেই। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন যে পরিমাণ সরকারি ভূমি উদ্ধার করেছে সারাদেশে এই উদ্ধার অভিযান চলাতে হবে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এক্ষেত্রে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে দেশে সকল জেলা প্রশাসন এমন উদ্যোগ কর্যকর করলে দেশে কোটি কোটি টাকার বেহাত হয়ে যাওয়া সম্পত্তি ফিরে আসবে সরকারের হাতে। ফলে সরকারি রাজস্ব আয় সম্মৃদ্ধ হবে। অবৈধ বেখাত হয়ে যাওয়া ৮৬১ কোটি টাকা মূল্যের ভূমি উদ্ধারে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের যে উদ্যোগ তার জন্য আমরা সংশ্লিষ্টদের সাধুবাদ জানাই।
জনকল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে অব্যাহতভাবে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। সরকারি জমি অবৈধ দখলমুক্ত করা, পাহাড় রক্ষায় নজরদারি, খাসজমি বন্দোবস্ত, জলাবদ্ধতা নিরসনে সহযোগিতা এবং নাগরিক ভূমি সেবা স¤প্রসারণ- সব মিলিয়ে গত এক বছরে আশানুরূপ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এর ফলে সরকারের সম্পদ সুরক্ষার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
আমরা দেখতে পেয়েছি চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম যোগদানের পর সরকারি বেহাত হওয়া জমি উদ্ধারে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন। সবার সহযোগিতায় এক্ষেত্রে তিনি ইতোমধ্যে সাফল্য পেয়েছেন। সরকারি সম্পদ দখলমুক্ত করাই তার অঙ্গীকার। যেসব সরকারি জমি এখনও দখলে রয়েছে, সেগুলোর বিষয়েও আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া তিনি চলমান রেখেছেন।
এক বছরে উদ্ধার ১৬২ একর জমি, জেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ১৬২ দশমিক ৩৭ একর সরকারি জমি উদ্ধার করা হয়েছে। এসব জমির বাজারমূল্য প্রায় ৮৬১ কোটি টাকা। বিশেষ করে গত অক্টোবর মাসে ১২টি সরকারি সংস্থার সমন্বয়ে কালীর ছড়া খালে দু’দিনব্যাপী অভিযান চালিয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় গড়ে ওঠা ৭০টির বেশি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়।
সীতাকুন্ড ও কাট্টলিতে বড় সাফল্য, সীতাকুন্ড উপজেলার তুলাতলী মৌজায় ১১৩ দশমিক ৬৩ একর সরকারি জমি উদ্ধার করা হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩৬৫ দশমিক ৭০ কোটি টাকা। ভবিষ্যতে যাতে পুনরায় দখল না হয়, সেজন্য সেখানে এক হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছে। এছাড়া নগরের হালিশহর, দক্ষিণ কাট্টলি ও উত্তর কাট্টলি মৌজায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় ৪০ একর জমি উদ্ধার করা হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা।
চিড়িয়াখানার জমি ফেরত, গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার প্রায় আট একর জমি বেদখল হয়ে যায়। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ওই জমি পুনরুদ্ধার করা হয়, যার বাজারমূল্য আনুমানিক ৪০ কোটি টাকা। উদ্ধারকৃত জমিতে নতুন রাস্তা নির্মাণের মাধ্যমে চিড়িয়াখানার আয়তন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
ভূমি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ২২টি ভূমি সেবা সহায়তা কেন্দ্র। এর মাধ্যমে সেবাগ্রহণকারীদের সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমেছে। এছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সঙ্গে সমন্বয় করে জেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করছে। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে চলা কোরিয়ান ইপিজেডের জমি-সংক্রান্ত জটিলতাও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সমাধান হয়েছে। গত ৬ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসক আনুষ্ঠানিকভাবে ২ হাজার ৪৮৩ একর জমির দলিল কোরিয়ান ইপিজেড কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করেন।
চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়গুলোকে পাঁচটি জোনে ভাগ করে নিয়মিত মনিটরিং করছে জেলা প্রশাসন। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি এড়াতে নিয়মিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এর মধ্যে ১৩টি পরিবারকে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। গত এক বছরে পাহাড় কাটা রোধে ২৬টি অভিযান পরিচালনা এবং ১৬টি মামলা দায়ের করেছে প্রশাসন।
বালুমহালে শৃঙ্খলা ফিরছে , গত বছর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বালুমহালগুলোতে অরাজকতা তৈরি হলে প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নেয়। চলতি বাংলা বছরের শুরু থেকে ৩১টি বালুমহাল ইজারা দিয়ে প্রায় ১৪ দশমিক ৯৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৯০ কোটি টাকা বেশি। অন্যদিকে অবৈধ বালু ও মাটি উত্তোলন রোধে গত এক বছরে ৫৬টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ৭৪টি মামলা করা হয়। এতে ২৫ জনকে কারাদন্ড এবং ৩৪ দশমিক ৭৪ লাখ টাকা জরিমানা আদায় হয়।
সরকারি ভূমি উদ্ধারে দেশের সকল জেলা প্রশাসন উদ্যোগী হলে সারাদেশে অবৈধ ভূমিদখল বন্ধ হয়ে যাবে এমন ধারণা দেশবাসীর।