চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে

2

দেশের তৃতীয় বৃহত্তম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রাকৃতিক পরিবেশে সৌন্দর্যমন্ডিত এবিশ্ববিদ্যালয়ে বার বার গ্রামবাসী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন সময় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশকে বারবার বাধাগ্রস্ত করে। তবে এবারের অপ্রীতিকর ঘটনা সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এধরনের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি থানা স্থাপন জরুরি। হাটহাজারি থানার পুলিশের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা যথাযথভাবে সম্ভব হয় না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের (গ্রামবাসী) দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গত শনিবার রাতের ঘটনার ধারাবাহিকতায় গত রবিবার দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষ শুরু হলে পুরো ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন, প্রক্টর, পুলিশ ও দুই সহকারী প্রক্টর ও শিক্ষার্থীসহ ১৫শ জন আহত হন। তাদের মধ্যে ৫০০ জনকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
চবি মেডিক্যাল সেন্টারের সিনিয়র মেডিক্যাল অফিসার ফারহানা পারভীন বলেন, দুপুর ২টা পর্যন্ত আমরা প্রায় ১৫শ আহতের চিকিৎসা দিয়েছি। গুরুতর আহত প্রায় ৫০০ জনকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
জানা গেছে, গত শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে মারধরকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। যা গত রবিবার বিকাল পর্যন্ত চলে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সোমবার রাত ১২টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশপাশে ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। দফায় দফায় সংঘর্ষের ১৪ ঘণ্টা পর বিকেল ৫টার দিকে ক্যাম্পাসে মোতায়েন করা হয় যৌথবাহিনী। ক্যাম্পাসে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
চমেক পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপ-পরিদর্শক বেলায়েত হোসেন বলেন, অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। বেশিরভাগই মাথায় ও শরীরে আঘাতপ্রাপ্ত। তাদের মধ্যে একজনকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে।
প্রক্টর তানভীর হায়দার আরিফ বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও পর্যাপ্ত ছিল না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। আমাদের প্রো-ভিসি, সহকারী প্রক্টর ও নিরাপত্ত দপ্তরের অনেক সদস্যসহ কয়েকশ শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
শিক্ষার্থীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই নম্বর গেটের কাছে এক ছাত্রী একটি ভবনে ভাড়া থাকেন। শনিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে তিনি ওই ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করলে দারোয়ানের সঙ্গে তার তর্ক হয়। একপর্যায়ে ভবনের দারোয়ান ওই ছাত্রীকে মারধর করার অভিযোগ উঠে। এ ঘটনার খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা দারোয়ানকে আটক করতে যায়। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তখন শিক্ষার্থীদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয় এবং পরিস্থিতি দ্রুত সংঘর্ষে রূপ নেয়।
দফায় দফায় হামলা : শিক্ষার্থীদের ওপর স্থানীয়দের রাত সোয়া ১২টার দিকে শুরু হওয়া হামলা ভোররাত পর্যন্ত চলে। স্থানীয় লোকজন মাইকে ডেকে লোক জড়ো করে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কয়েক দফায় সংঘর্ষে স্থানীয়রা দা, রামদা, লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। শিক্ষার্থীরাও পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা স্থানীয়দের ওপর হামলা চালিয়েছে। ভাঙচুর করা হয়েছে ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
রাতে সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. কোরবান আলী ও নাজমুল হোসেইন এবং নিরাপত্তা প্রধান আবদুর রহিম আহত হয়েছেন। হামলাকারীরা প্রক্টরিয়াল বডির গাড়ি, পুলিশের টহলগাড়ি ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি গাড়ি ভাঙচুর করেছে বলে জানা গেছে।
রাতের সংঘর্ষের জের ধরে স্থানীয়রা রবিবার সকালে দুই নম্বর গেটে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের বাসার সামনে দেশীয় অস্ত্র হাতে মহড়া দিতে শুরু করে। এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক গ্রুপে প্রচার হলে ক্যাম্পাসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা দুই নম্বর গেটের দিকে জড়ো হয়। এসময় স্থানীয়রা শিক্ষার্থীদের দিকে ইট-পাটকেল মারতে শুরু করে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সেখারে যান উপ-উপাচার্য অধ্যাপক কামাল উদ্দিনসহ প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা। সেখানে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হলে শিক্ষার্থীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। স্থানীয়রা পাল্টা প্রতিরোধ শুরু করলে উপ-উপাচার্য কামাল, প্রক্টর অধ্যাপক তানভীর হায়দার আরিফসহ অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত হন। এদের মধ্যে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের নাঈম রহমানকে চমেক হাসপাতাল থেকে ন্যাশনাল হাসপাতালের আইসিইউতে প্রেরণ করা হয়েছে।
প্রক্টরিয়াল বডির অসহায়ত্ব : শনিবার রাতে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পরপরই শিক্ষার্থীরা প্রক্টরিয়াল বডির সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, প্রথম দেড় ঘণ্টা তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছলেও ততক্ষণে অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত হন। এছাড়া রবিবার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের দফায় দফায় সংঘর্ষ হলেও টানা চার ঘণ্টা কোন পুলিশ বা সেনা সদস্যকে ঘটনাস্থলে দেখা যায়নি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, জনসাধারণের জীবন ও সম্পদ রক্ষা, শান্তি-শৃঙ্খলা স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে হাটহাজারী উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই নম্বর গেট বাজারের পূর্বসীমা থেকে পূর্বদিকে রেলগেট পর্যন্ত সড়কের উভয়পাশে রবিবার দুপুর ২টা থেকে সোমবার রাত ১২টা পর্যন্ত ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা পরিকল্পিত মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলো অস্থিতিশীল করতে একটি কুচক্রিমহল তৎপর। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থিতিশীলতা নষ্টে এবং দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির মাধ্যমে ২৪ এর পরাজিত শক্তি ও তাদের দোষররা ইতোমধ্যেই তৎপর হতে দেখা গেছে। কিন্তু স্বৈরাচারি সরকারের সাজানো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় যথাযথ ভূমিকা রাখছে না। সরকার এক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এ অবস্থা হতে দেশ ও জাতিকে রক্ষায় অন্তরর্বর্তী সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে এমন অভিমত দেশবাসীর।