পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গারা দেশের একটি বাড়তি সমস্যা। দীর্ঘদিন হতে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘসহ বিশ্বের দাতাদেশসমূহ সাহায্য করে আসছে। বিদেশি সাহায্য পর্য্যাপ্ত নয়, বাইরের সাহায্য নিয়ে বছরের পর বছর দেশের পক্ষে এসমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই কূটনৈতিক উপায়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা করাই উত্তম। দীর্ঘদিন হতে দেশের রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান হচ্ছে না, দেশের কূটনৈতিক দুর্বলতার কারণে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশের রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ে সক্রিয় নজর দেন। জাতিসংঘ মহাসচিবকে তিনি নিয়ে আসেন দেশে। ফলে এসমস্যা সমাধানে কিছুটা অগ্রগতি হতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে আশ্রিত মিয়ানমারের নাগরিকদের নিয়ে যে সংকট চলছে, তার ‘স্থায়ী সমাধান’ হিসেবে প্রত্যাবাসনের জন্য কাজ করার কথা জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমান। গত১৭ আগস্ট রোববার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ক‚টনৈতিকদের ব্রিফ করার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, সবচাইতে বড় কথা হচ্ছে যে- আমরা এই সমস্যাটির একটি আশু এবং স্থায়ী সমাধান চাই, তো সেটাই। আপনি আন্তর্জাতিক সাহায্য দিয়ে কতদিন রাখবেন, তাদের তো বাড়ি ফিরতে হবে। সেটাই তো আসল কথা।
তবে বাস্তবতার নিরিখে এদেশের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা যে গুরুত্বপূর্ণ তা মানছেন খলিলুর। তার কথায়, সাহায্য ইম্পর্টেন্ট। কারণ সেটা যদি কমে যায়, নানা ধরনের মানবিক সমস্যা দেখা দেয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর তার প্রতিক্রিয়া পড়ে। তো সাহায্য যাতে অব্যাহত থাকে, সে প্রচেষ্টা তো আমরা সবাই মিলে করছি এবং কিছু কিছু দাতা দেশ থেকে কিছু উদ্যোগের নিশানা পাচ্ছি।
প্রধান উপদেষ্টার উপদেষ্টা পদমর্যাদার কর্মকর্তা খলিলুর বলেন, আমি আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়কে একটি কথা সবসময় বলি যে, গত আট বছরে আমরা পাঁচ বিলিয়নের ওপর খরচ করেছি আন্তর্জাতিক স¤প্রদায় রোহিঙ্গাদের ওপরে। এরা আসবার আগে কয় টাকা খরচ হয়েছে? এক পয়সাও না। রোহিঙ্গারা যখন ফিরে যাবেন, তাদের ভূমি অত্যন্ত উর্বর; তাদের পানিতে যথেষ্ট পরিমাণ মাছ পাওয়া যায়। আমরাই তো তাদের কাছ থেকে শস্য কিনতাম একসময়। পৃথিবীর কোনো প্রয়োজন তাদের কাছে নাই। তো তাদের ফিরিয়ে দিলে সবার জন্য মঙ্গল।
বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গা ঢলের শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। এরপর কয়েক মাসের মধ্যে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়। আগে থেকে ওই এলাকার ক্যাম্পে বসবাস করছিল আরও চার লাখ রোহিঙ্গা।
আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৭ সালের শেষ দিকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হয় মিয়ানমারের অং সান সু চি সরকার। ওই বছর সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতেও সই করে।
পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চলার এক পর্যায়ে ২০১৯ সালে দুই দফায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের প্রতিশ্রæতিতে রোহিঙ্গারা আস্থা রাখতে না পারায় সেই চেষ্টা ভেস্তে যায়।
২৫ আগস্ট কক্সবাজারে স্টেকহোল্ডার কনফারেন্স আয়োজনের কথা তুলে ধরে খলিলুর রহমান রোববার বলেন, জাতিসংঘে আগামী সেপ্টেম্বরের ৩০ তারিখে রোহিঙ্গা বিষয়ক যে আন্তর্জাতিক সম্মেলন হচ্ছে, তারই প্রস্তুতির একটা অংশ হিসেবে আমরা করেছি।
রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক আলোচনা থেকে ‘খসে পড়ার’ প্রেক্ষাপটে এ সম্মেলন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান খলিলুর।
তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা গত বছর জাতিসংঘের সাধারণ সভায় একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলন আহবান করার জন্য জাতিসংঘের সকল সদস্যকে আহবান জানিয়েছিলেন
এবং সেটাতে তাৎক্ষণিকভাবে আমরা সাড়া পেয়েছি। সর্বসম্মতিক্রমে এই কনফারেন্সটা আহবান করার সিদ্ধান্ত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ গ্রহণ করে এবং বিশ্বের ১০৬টা দেশ এটাকে স্পন্সর করে। সুতরাং এখন আন্তর্জাতিক সমর্থন যথেষ্ট পরিমাণ আছে।
প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ বলেন, এই সম্মেলন হচ্ছে রোহিঙ্গাদের জন্য এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য- এই সমস্যার একটা স্থায়ী এবং আশু সমাধানের পথনির্দেশিকা দেওয়ার একটা বড় সুযোগ।
আমরা সেই কারণে রোহিঙ্গাদের কণ্ঠস্বর, তাদের কথা, আশা-আকাক্সক্ষা, তাদের স্বপ্ন- এগুলো আমরা সেই কনফারেন্সে নিয়ে যেতে চাই।
জাতিসংঘে অনুষ্ঠিতব্য রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ক কনফারেন্স রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া সহজতর হবে এমন আশা দেশবসীর।






