শান্ত হোক নেপাল

1

নেপালের কেপি শর্মা ওলি সরকারের বিরুে দ্ধ বহুদিন ধরেই ছিল দুর্নীতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ। এ অভিযোগকে উপলক্ষ করে বাংলাদেশের মত দেশটির তরুণ ছাত্র সমাজ সংগঠিত হতে থাকে। তারা সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক বিক্ষোভের ডাক দেন। এরমধ্যে সরকার প্রথমদিকে সহনশীল হলেও পরে এ বিক্ষোভকে নিয়ন্ত্রণ করতে গত ৪ সেপ্টেম্বর থেকে নেপালে নিষিদ্ধ করা হয় এক্স, ফেসবুক, ইউটিউবসহ প্রায় সব ক’টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার। তবে নেপাল সরকার দাবি করে যে, এই সামাজিক মাধ্যম তথা সংস্থাগুলি নেপাল প্রশাসনের সঙ্গে সরকারিভাবে নথিভুক্ত হয়নি। নেপাল সরকার ৭ দিনের সময়সীমা দিয়েছিল সংস্থাগুলিকে, কিন্তু সেই সময়সীমা মানেনি ২৬টি সমাজমাধ্যম। ২০২০ সাল থেকে অনেক পিটিশন জমা পড়েছিল লাইসেন্সবিহীন প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট এবং বিজ্ঞাপন প্রচারের অভিযোগে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে সরকার হস্তক্ষেপ করে। সেই কারণেই সমাজমাধ্যমগুলিকে নিষিদ্ধ করে নেপাল সরকার। এই সিদ্ধান্তে বিক্ষুব্ধ নেপালের তরুণ প্রজন্ম। যদিও ভাইবার, টিকটক, ইন্সটাগ্রাম, উইটক, টেলিগ্রাম ইত্যাদি কিছু সমাজমাধ্যমকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। এরপরও প্রতিবাদে দেশটির তরুণ ছাত্র সমাজ সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। তারা সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ করতে থাকে। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সরানোর জন্য লাঠিচার্জ করতে শুরু করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কারফিউ জারি করা হয় রাজধানী কাঠমুÐুতে। এরপরেও বিক্ষোভ চলতে থাকায় সরকারের পক্ষ থেকে নামানো হয় সেনা এবং ‘শুট অ্যাট সাইট’ আদেশ দেওয়া হয়। সেনাবাহিনীর গুলিতে মৃত্যু হয়েছে ২১ জনের। আহত হয়েছেন ১০০ জনেরও বেশি মানুষ। তবে দেশটির বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি দাবি করছেন, সরকারের তরফ থেকে সমাজমাধ্যম নিষিদ্ধ করার পেছনে রয়েছে ভিন্ন উদ্দেশ্য। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিকে ব্যবহার করে যেন কেউ সরকারের বিরুদ্ধে কোনোরকম প্রতিবাদ জানাতে না পারে সেই কারণেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিকে। আসলে শুরু থেকে সোশ্যাল মিডিয়া সংক্রান্ত যে বিল দেশটির সংসদে পাশ করা হয়েছে সেটি ঘিরে শুরু হয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। দাবি করা হচ্ছে যে, এই পদক্ষেপ আসলে দেশের নাগরিকদের স্বাধীনতা হরণ করার চেষ্টা। সোমবার সন্ধ্যাবেলায় ডাকা হয় ক্যাবিনেটের বৈঠক। কাঠমুন্ডুর উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল এই বৈঠকে। কিন্তু তার আগেই বিক্ষুব্ধ ছাত্র সমাজ দেশটির জাতীয় সংসদ দখলে নেন। গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, বিক্ষোভের কারণে প্রাথমিকভাবে কারফিউ জারি করা হয় বানেশ্বর এলাকায়। পরে প্রধানমন্ত্রী বাসভবন বালুওয়াটার, রাষ্ট্রপতির বাসভবন শীতলনিবাস, উপ-রাষ্ট্রপতির বাসভবন লাইনচৌর, সিংহদুরবার, মহারাজগঞ্জসহ সংবেদনশীল এলাকাগুলিতে কারফিউ জারি করা হয়েছে। জেলা কর্মকর্তা ছাবিলাল রিজাল স্থানীয় প্রশাসন আইনের ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী কারফিউ জারি করার নির্দেশ দেন। কারফিউ জারি থাকবে দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। ওই সময়ে কোনোরকম জনসমাগম, অবরোধ বা মিছিল করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির নিজের শহরেও পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। অনেক মানুষ জখম হয়েছেন সেখানেও। এতো কিছুর পরও শেষ রক্ষা হয়নি কেপি শর্মা ওলি সরকারের। সর্বশেষ বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা জাতীয় সংসদ, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর ও স্থাপনাগুলো দখলে নেন। কেপি শর্মা ওলিও সর্বশেষ দেশ ত্যাগ করে ভারতে হেলিকপ্টার যোগে ভারতে আশ্রয় নেন। ঘটনার আদ্যপান্ত ২০২৪ সালের বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের সাথে তুলনা করা যায়। তবে ওই দেশের ছাত্র সমাজ বিপ্লব পরবর্তী সরকারের কোন দপ্তর অগ্নিসংযোগ করেনি, ভাঙচুর করেনি বা লুটপাঠের মত ঘটনাও ঘটেনি। অর্থাৎ সরকারি বা জাতীয় সম্পদকে সুরক্ষা করেই তাদের আন্দোলন চূড়ান্ত সফলতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। জানা যায়, দেশটিতে একটি অন্তবর্তী সরকার প্রতিষ্ঠার তোড়জোর চলছে। যেভাবেই হোক আমাদের উপমহাদেশীয় প্রতিবেশি রাষ্ট্র নেপালের শান্তি কামনা করছি। একটি আকর্ষণীয় পর্যটন নগরী কাঠমুন্ডু। হিমালয়ের এ দেশ বরফ আচ্ছাদিত। এখানের মানুষও বরফের মত শিথল। সরকার একান্ত স্বেচ্ছাচারি না হলে, অনিয়ম ও দুর্নীতিগ্রস্ত না হলে এতোবড় আন্দোলন করা যায় না। এর আগে ২০২২ সালে দুর্নীতির অবিযোগে গণঅভ্যুত্থান ঘটেছিল শ্রীলঙ্কায়। ২০২৪-এ বাংলাদেশেও ঘটেছে একই ঘটনা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জরুরিকালীন পরিস্থিতিতে দেশ ছেড়ে যান। এবার নেপালেও তৈরি হল একইরকম বিক্ষোভের পরিস্থিতি। আমরা নেপালসহ সার্কভুক্ত দেশসমুহে গণতন্ত্র, সাম্য, শান্তি ও স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরে আসুক-এমনটি কামনা করি।