স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে বড় অর্জন

2

কয়দিন আগে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ও অস্থায়ী ১৫ টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৪টি গাজায় যুদ্ধ বিরতির পক্ষে ভোট দিলেও যুক্তরাষ্ট্র বরাবরের মত ভেটো দিয়ে মূলত গাজায় ইসরায়েলি নৃশংসতাকে উস্কে দিয়েছে বলে মনে করেন বিশ্ব সম্প্রদায়। গাজায় দিনের পর দিন বিমান হামলা করে, বোমা মেরে, ট্যাংক দিয়ে যখন গত দুই বছরে প্রায় ৬৫ হাজার গাজা অধিবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করছে, গাজার সমস্ত স্থাপনা ধ্বংসস্তুপে পরিণত করছে, হাসপাতাল, স্কুল ও মসজিদকে বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছে, এমনকি পানি ও খাবারের অভাবে যখন হাজার হাজার শিশু, নারী ও বৃদ্ধ মৃত্যুর কোলে ঢুলে পড়ছে- জাতিসংঘ যখন গাজাকে দুর্ভিক্ষ কবলিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে তখনও ইসরায়েলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এমন আটঘাটে বাকরুদ্ধ বিশ্ব বিবেক। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ধ্বজাধারী আমেরিকার এমন ভূমিকায় ক্ষুব্ধ বিশ্ব সম্প্রদায়। সম্প্রতি যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে এ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বলে মন্তব্য করছেন বিশ্লেষকরা। গতকাল ২১ সেপ্টেম্বর, রবিবার একসাথে এ সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ করেন দেশ তিনটি। এর আগে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকাসহ প্রায় শতাধিক দেশ স্বাধীন ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্ব সম্প্রদায় মনে করছেন, গাজার চরম মানবিক বিপর্যয়ের সময় যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার এমন সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। আমরা মনে করি, ইউরোপের এ তিন বৃহৎ শক্তির (যারা আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্রও বটে) এ স্বীকৃতি ইসরায়েলি আধিপত্যবাদ ও মানবতা বিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে চরম চপেটাঘাত। তিন রাষ্ট্রের ফিলিস্তিন স্বীকৃতির এখবর বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে প্রথম প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি দেশের এমন সিদ্ধান্ত মূলত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও দুই রাষ্ট্রের সমাধানের আশাকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা হিসেবে নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার এ ঐতিহাসিক স্বীকৃতি ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের জন্য একটি স্থিতিশীল এবং নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রত্যাশা প্রকাশ করেছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে যে বিবৃতি দেন তাতে উল্লেখ করেন ‘আজ আমরা শান্তির আশা ও দুই রাষ্ট্র সমাধানকে পুনরুজ্জীবিত করতে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করছি, যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে আমরা শান্তি ও দুই রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনা জীবিত রাখতে এই পদক্ষেপ নিচ্ছি। এর মানে হচ্ছে, একটি নিরাপদ ও সুরক্ষিত ইসরায়েল এবং একটি কার্যকরী ফিলিস্তিন রাষ্ট্র যা বর্তমানে নেই। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবেনিস এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কানিও একই কথা ব্যক্ত করেছেন। রবিবার যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের আরো দুটি রাষ্ট্রের ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা আসার পর বিশ্বব্যাপী উচ্ছ¡াস লক্ষ করা যায়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এ পদক্ষেপকে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতিতে এটি একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন। এতদিন লন্ডনের অবস্থান ছিল, শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই স্বীকৃতি দেওয়া হবে এবং সেটি আসবে সর্বোচ্চ প্রভাবের সময়ে। কিন্তু গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয় এবং ইসরায়েলের অমানবিক অভিযান যুক্তরাজ্যকে নতুন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য করেছে। সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহে গাজার পরিস্থিতি ভয়াবহভাবে অবনতি হয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী আগেই গাজার দুর্ভিক্ষ ও সহিংসতাকে ‘অসহনীয়’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। সর্বশেষ ইসরায়েলি স্থল অভিযানে লাখো মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা এই অভিযানকে ‘বিপর্যয়কর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সপ্তাহের শুরুতে জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশন জানায়, গাজায় ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে। তবে ইসরায়েল এ অভিযোগকে ‘বিকৃত ও মিথ্যা’ বলে নাকচ করেছে। ব্রিটিশ মন্ত্রীরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তির আশা বাঁচিয়ে রাখতে এই পদক্ষেপ নেওয়ার নৈতিক দায়িত্ব ছিল তাদের। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের অব্যাহত সম্প্রসারণ, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ, এই সিদ্ধান্তে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
উল্লেখ্য যে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের আকস্মিক হামলার পর ইসরায়েলি সেনারা গাজায় ভয়াবহ অভিযান শুরু করে। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, তখন থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৬৪ হাজার ৯৬৪ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমানে জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ ফিলিস্তিনকে ইতোমধ্যেই স্বীকৃতি দিয়েছে। গত বছর স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও নরওয়ে এই স্বীকৃতি দেয়। সা¤প্রতিক সময়ে পর্তুগাল, ফ্রান্স, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াও একই পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিয়েছে।